ছেলেবেলা – সুদীপ ঘোষাল

ছেলেবেলা – সুদীপ ঘোষাল

ছেলেবেলা     (অনুগল্প)

সুদীপ ঘোষাল

অতনুর মনে পড়ে, রাজু আর তার দশজন বন্ধু পুজো বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেয়াল ঘেঁষে বসত। পুরোনো কারুকার্যের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে ভালোবাসার গান বিরাট বাড়িতে প্রতিধ্বনি শোনাত।
দরজা ঘাটের বাঁধানো ঘাটে পানকৌড়ি আর মাছরাঙার কলা কৌশল দেখে পার হয়ে যেত অবাধ্য সময়। অন্ধকারে ফুটে উঠত কালীতলার সার দেওয়া প্রদীপ। ঘরে ঘরে বেজে উঠত শঙ্খধ্বনি। হাতগুলো অজান্তে চলে যেত কপালে। তারপর হাত পা ধুয়ে ভাইবোন একসাথে বসে সরব পাঠের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। কে কত জোরে পড়তে পারে। একবার বুলু কাকা বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন অতনু পড়ছে, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়। ঘরে ঢুকে কাকা বললেন, ন্যাটিওনাল নয়, ওটা ন্যাশনাল। ঠিক করে পড়। অতনু জোরে পড়ছে বলে উচ্চারণটা ঠিক হল। তারপর পড়া হয়ে গেলে একান্নবর্তী পরিবারের সবাই উঠোনে খেতে বসত। আলাদা করে কোনো শিশুকে খাওয়া শিখতে হত না, জোর করতে হত না। সবার খাওয়া দেখে ধীরে শিখে যেত নিজে খাওয়ার কায়দা।
শোওয়ার পালা ছিল মজাদার। বড় লেপে তিন ভাই ঢাকা নিত। কেউ একটু বেশি টানলেই খেলা শুরু হয়ে যেত রাতে। কোনো কোনো দিন ভোরে। বড়দা আরও ভোরে উঠে নিয়ে রাখতেন জিরেন কাটের খেজুর রস। সকালে উঠেই খেজুর রস। সেই দিনগুলো আর কি ফিরবে? বড় মন খারাপ হয় বড়ো হয়ে যাওয়া অতনুর।
তারা একসাথে ঘুরত। খেলতো নানারকমের খেলা। চু কিতকিত, কবাডি, সাতগুটি, ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও আরও কত কি। বন্ধুরা জড়ো হলে, এলাটিং, বেলাটিয়ং সই লো, যদু মাষ্টার কইলো…, তারপর আইশ, বাইশ কত কি। হাততালি দিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে খেলত, কাটুরিস, চায়না প্লিজ, মেম সাব, মেইন আপ… ।

তারপরের কথা, খেলা ডুব দিয়েছে কোন অতলে জানি না, অতনু বলত, সব কথা পুরো মনে পড়ে না। ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতিগুলো হৃদয়ের পদ্মপুকুরে ভেসে উঠেই ডুব দেয়, আর হারিয়ে যায় ব্যস্ত সংসারে।