নিরুত্তরের যন্ত্রণা – গুলশন ঘোষ

নিরুত্তরের যন্ত্রণা   (অনুগল্প)

গুলশন ঘোষ

দাঁড়িয়ে মীনু। হাতে বরফ। প্রচণ্ড গরমে তা দ্রুত গলে গড়িয়ে পড়ছে।
১৩, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট।
দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যান-রিকশায় দু’জন মুটে ধপাস ধপাস শব্দে বইয়ের বান্ডিলগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। উদাসীন ভাবে। নিত্য বাধ্যতার বিরক্তি নিয়ে। লাফিয়ে ওঠে ভ্যানে। দাঁড়ায় বইয়ের গাদায়। অসংলগ্ন বান্ডিলগুলো সাজায়।
এভাবেই প্রতিদিন পায়ে দলা বই প্রেস হয়ে চলে যায় দোকানে। পাঠকের কাছে।
কোন পাঠক বই রাখে যত্নে। কেউ বা অযত্নে। কেউ বুকে। বিছানায় অথবা শেল্ফে।
ধর্মীয় বই থাকে নমস্য হয়ে।
নবীন থেকে অভিজ্ঞ ও খ্যাত থেকে বিখ্যাত কতশত লেখক নিয়মিত লেখেন। তার মধ্যে কোন কোন বই ঘিরে থাকে লেখকের কত রাত জাগা পরিশ্রমের বাষ্পীভূত স্বপ্ন। বাৎসল্য। সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।
কখনো কখনো জ্ঞানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেমেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদী মনোভাবে। হয়ত বা হয়েছে পুরস্কৃত রাষ্ট্রের গুণগানে। কিংবা অন্য কতশত পুরস্কারে ভূষিত- সেসব বই কাগজে মোড়া বান্ডিল হয়ে থাকে। তারপর সেসব বই প্রতিদিন পৌঁছে যায় পাঠকের হাতে। এভাবেই পদপৃষ্ট হয়ে।
তাতে মুটের কী বা যায় আসে। ধপাস ধপাস শব্দ করে ছুঁড়ে ফেলে ভ্যান-রিকশায়। রোজ। রোদ-বৃষ্টি-ঘাম।

মীনুর মুচড়ে ওঠে বুক। কে যেন কাঁদছে। স্বপ্ন। পরিশ্রম। কতগুলো বছর। সব পণ্ড।
একটি বইও পাঠকের হাতে পৌঁছালো না তার। তার জ্ঞানের উত্তাপ পেল না কেউ। জানলো না রবির আলোকে নতুনভাবে রবি ঠাকুর’কে দেখার কথা – তাতে কী বিশাল ক্ষতি হয়ে গেলো — ভাবল মীনু।
ভাবনার ভূমিকম্পে ভূগোল বদলে গেল তার।
‘লিখব না। আর একটা লাইনও লিখবো না। কাগজে মোড়া বান্ডিল করা বইগুলো এক জায়গায় জড়ো করে দেশলাই জ্বালিয়ে দিলে কেমন হয়!’ – এই কথা ভাবতে ভাবতে প্রকাশককে নমুনা হিসাবে যে বইটা দেবে বলে এনেছিল – তা ব্যাগে পুরে নিল মীনু।
তখনই তার চোখে পড়ে ফুটপাতে, উন্মুক্ত র‍্যাকে, কতশত নাম না জানা বই। জ্ঞানের সূর্য কালো অক্ষরে ঠাসা হয়ে পড়ে আছে অন্ধকারে।
হয়ত এভাবেই রাষ্ট্রীয় প্রহসনে চাপা পড়ে যায় কতশত প্রতিবাদ, হাসি-কান্নার ভাষা। বিজ্ঞানের আবিষ্কার। উন্নয়ণের অর্থনীতি। সুস্বাস্থ্যের পরামর্শ। সুস্থ পৃথিবীর মন্ত্র।
যা উদাসীন মুটের মতোই পদপৃষ্ঠের ভারে গণতন্ত্র-পার্লামেন্ট বিশ্বজুড়ে — যুগ হতে যুগে নিরুত্তরের যন্ত্রণায় চাপা পড়ে মরে।