পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ-স্মৃতি – প্রসেনজিৎ রায়

পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ-স্মৃতি – প্রসেনজিৎ রায়

পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ-স্মৃতি

প্রসেনজিৎ রায়

কাজের চাপে তেমন ঘোরাঘুরি হয়ে ওঠে না আমার। তাই এবার ডিসেম্বরে শীতে কোনোভাবে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে আমরা চলে গেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ ঘুরতে। আমরা মানে সস্ত্রীক আমি। ওয়েস্ট বেঙ্গল ঘোরার জায়গার পরিকল্পনার লিস্টে ছিল কলকাতা, দিঘা, মায়াপুর, এরপর দার্জিলিং। তো আমরা প্রথম আগরতলা এয়ারপোর্ট থেকে চলে গেলাম ফ্লাইটে করে নেতাজি সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, এরপর ওখান থেকে আমরা একটা হলুদ ট্যাক্সি নিলাম কারণ কলকাতা মানেই হলুদ ট্যাক্সি। যেহেতু প্রথমবার গেছি কলকাতায় ঘুরতে তাই আমার ওয়াইফ বলল সে হলুদ ট্যাক্সিতে করে যেতে চায়, সুতরাং আমরা একটা হলুদ ট্যাক্সিতে সেখান থেকে চলে গেলাম প্রিটোরিয়া স্ট্রিট।
প্রিটোরিয়া স্ট্রিটে গিয়ে আমরা ত্রিপুরা ভবনে উঠলাম, আগে থেকেই আমাদের রুম বুক ছিল। একটা ডাবল রুম নিয়েছিলাম আমরা, বেশ বড়ো রুম — আমাদের দেখেই পছন্দ হয়ে গেছিল। ওইদিন বিকালে একটু বেরোলাম দুজনে আশেপাশে কিছু পাই কিনা কেনার জন্য। সেদিন আমি কিছু কিনিনি, শুধু বাবার জন্য একটা ব্লেজার নিয়েছিলাম আর আমার স্ত্রী টুকটাক কিছু জিনিসপত্র কিনল। এরপর আমরা আবার ত্রিপুরা ভবনে চলে এসে রাতের জন্য বিশ্রাম নিলাম আর কোন দিকে বেরোইনি।
পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই স্নান সারলাম। এরপর সোজা চলে গেলাম ময়দান মেট্রো স্টেশনের উদ্দেশ্যে, যাবার পথে আমরা দেখতে পেলাম এলিয়ট পার্ক, সেখানে একটু ঢুকে দু-তিনটে ফটো নিলাম, বেরিয়ে এর পাশে ময়দান মেট্রো স্টেশনে গেলাম। কারণ কলকাতায় যাব আর মেট্রোতে চড়ব না এটা কি কখনো হয় ? এরপর ময়দান মেট্রো স্টেশন থেকে মেট্রো করে আমরা পৌঁছলাম দক্ষিণেশ্বর মেট্রো স্টেশনে, যার সাথেই দক্ষিণেশ্বর মন্দির – যেটা আমরা জানি রানি রাসমণি কোনো একজন ইংরেজের কাছ থেকে জায়গা ক্রয় করে সেখানে এই মন্দিরটি বানিয়েছিলেন। আমরা সেখানে পৌঁছে আমাদের কাছে যা জিনিস ছিল সব কিছু আমরা কাউন্টারে জমা দিলাম — মোবাইল থেকে শুরু করে ব্যাগ, জুতো যা কিছু আছে সব জমা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়, এরপর আমরা দুজনে লাইন দিয়ে গেলাম ভেতরে। ভেতরে গিয়ে আমরা মাকে দেখলাম দুচোখ ভরে লাইনে অনেক সময় দাঁড়ানোর পর; মাকে দেখে সেখান থেকে আসতে আর মন চাইছিল না, কারণ সবসময় আমরা মাকে টিভিতে বিভিন্নভাবে দেখেছি বা ফেসবুকে দেখেছি কিন্তু মায়ের মুখটা সামনে থেকে দেখে আরো মায়াবী বেশি লাগে, সেখানে আমরা মাকে পুজো দিয়ে বেরোলাম। বেরিয়ে চলে গেলাম বেলুড় মঠ দেখার জন্য। স্টিমারে করে দক্ষিণেশ্বর থেকে বেলুড় মঠে যাবার অনুভূতিটাই আলাদা। গঙ্গার ঘাট জুড়ে একের পর এক মন্দির। মনটা কেমন জানি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল, উঠাটাই স্বাভাবিক। বেলুড় মঠ দেখে সেখানে গঙ্গাঘাটে গিয়ে আমরা আমাদের হাতমুখে গঙ্গার পবিত্র জলটা লাগালাম, এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে সামনের একটি হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার সারলাম। যেহেতু আমরা মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলাম তাই সকাল থেকে আমাদের কিছুই খাওয়া হয়নি, ভীষণ খিদে পেয়েছিল। সেখানে আমরা ভুরিভোজ সেরে আবার লঞ্চে করে ফিরে এলাম দক্ষিণেশ্বরে, সেখান থেকে মেট্রো স্টেশন করে আমরা আবার চলে গেলাম ময়দান মেট্রো স্টেশনে।
সেখানে গুগল লোকেশন দেখে জানতে পারলাম যে আমরা যেখানে আছি এর থেকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম বেশি দূর নয়, তাই আমরা সেখান থেকে সোজা চলে গেলাম ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে ঢুকে দেখি এত কিছু তাদের সংগ্রহশালায় ! বিভিন্ন পুরাতন দিনের প্রাণী, জলজ প্রাণী, পাখি, মাছ, পাথর, জীবাশ্ম, আরো বিভিন্ন ধরনের মাটি — সবকিছু সংগ্রহ রয়েছে এই সংগ্রহশালাতে। সেখান থেকে আমি এবং আমার স্ত্রী ভালো করে দেখে বেরিয়ে আবার একটা হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরিবেশটা খুব আলাদা। ১৯০৫ থেকে ১৯২১ এর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল এটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো এক ইমারত এত সুন্দর, দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেখানে আমরা বাইরে বিভিন্ন ছবি নিলাম মোবাইলে আমাদের স্মৃতি রাখার জন্য। এরপর আমরা বেরিয়ে চলে এলাম সামনের বাগানের মত একটা খোলা জায়গা আছে সেখানে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে বেশ খানিকটা সময় খুব সুন্দর ভাবে কাটিয়ে আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আবার ফিরে এলাম ত্রিপুরা ভবনে, সেদিন আমাদের দিনের যাত্রা এখানেই শেষ হয়েছিল। ওই দিন রাতে আমরা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন আবার ঘুম থেকে উঠে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দিঘা ভ্রমণ। প্রথমে আমরা চলে গেলাম আমাদের ত্রিপুরা ভবন থেকে বেরিয়ে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনে, রেল স্টেশন প্লাটফর্মের বিচারে ভারতের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন হাওড়া, যেখানে ২৩ টি রেলওয়ে প্লাটফর্ম আছে। সেখান থেকে আমরা ট্রেনে করে চলে গেলাম দিঘাতে। রেলস্টেশনে নেমেই দেখা যাচ্ছিল দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের চূড়া। আমরা সোজা স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম জগন্নাথ মন্দিরে। পৌঁছে জগন্নাথ মন্দিরের বাইরে থেকে আমরা বিভিন্ন ধরনের ছবি নিতে থাকলাম, আমি এবং স্ত্রী মনমতো সেখানে ছবি উঠালাম। মন্দিরের ভিতরে ছবি উঠানো বারণ তাই আমরা ফটো উঠাতে পারিনি। ঠাকুরকে দর্শন করে বেরিয়ে এলাম আমরা, চেষ্টা করেছিলাম দুপুরে মন্দিরের প্রসাদ খাবার জন্য কিন্তু পৌঁছোতে একটু দেরি হয় সেদিন, তাই প্রসাদ পাইনি। অগত্যা আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে সোজা চলে এলাম হোটেলে, যেহেতু সকাল থেকে ওইদিনও আমরা কিছু খাইনি। তাই ভীষণ খিদে পেয়েছিল সেদিনও। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে একটা টোটো নিয়ে চলে গেলাম দিঘা সমুদ্র দেখতে। জীবনে প্রথমবারের মতো সমুদ্রকে সামনে থেকে দেখে খুব এক্সাইটেড লাগছিল আমাদের দুজনেরই। সেখানেই একজন ফটোগ্রাফার এল, সেই ফটোগ্রাফারের কাছে আমরা বেশ ১০-১২টা ছবি উঠিয়ে নিলাম এবং সেগুলোকে প্রিন্টও করালাম তাকে দিয়ে। এরপর আমরা নিজের মত আরও কিছুটা সময় সেখানে বসে কাটালাম। সন্ধ্যার আগে ফিরে এলাম দিঘা রেলওয়ে স্টেশনে এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে আবার ফিরে এলাম আমরা হাওড়া রেলস্টেশন। একটা ট্যাক্সি নিয়ে একটু ঘুরে চলে এলাম ত্রিপুরা ভবনে। আসার পথে আমরা রাইটার্স বিল্ডিং যেটা ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ে পড়েছি, তাও দেখে নিলাম বাইরে থেকে। এরপর ত্রিপুরা ভবনে এসে সেদিন ডিনার করে আবার ঘুমোতে চলে গেলাম, আমাদের দিন সেখানে শেষ।
পরদিন আমরা বেরোলাম মায়াপুরের উদ্দেশ্যে। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে যেতে হল হাওড়া স্টেশন। স্টেশন থেকে ট্রেনে করে পৌঁছলাম নবদ্বীপধাম ঘাট রেলওয়ে স্টেশন। নবদ্বীপ ধাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে একটা টোটো নিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ফেরিঘাট। ফেরিঘাট থেকে স্টিমারে করে পৌছালাম মায়াপুর, এই যাবার সময় নদীর যে একটা অপরূপ দৃশ্য সেটা জীবনে ভোলার মতো নয়। মায়াপুরে পৌঁছে আমরা একটা টোটো নিলাম, টোটো করে প্রথমেই গেলাম মায়াপুরের দুপুরের প্রসাদ খাবার জন্য টোকেন কাটতে। টোকেন কেটে আমরা ঘুরতে চলে গেলাম শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যেখানে শ্রীচৈতন্যদেবের ছোটবেলা কেটেছে তা দেখতে, তারপর আমরা দেখলাম শ্যামকুণ্ড, রাধাকুণ্ড এবং সেখানে একটা চমৎকার ঘটনা হয়েছে, যেখানে শ্যাম কুণ্ড সেখানে পৌঁছে দেখলাম লেখা ছিল যে কুন্ডের জলে পা ধোঁয়া বারণ, যাতে কেউ পায়ে জল না লাগায়। একজন মহিলাকে দেখলাম তিনি হঠাৎ করে জলে নেমে গেছেন উনার পাটা জলে স্পর্শ হতেই তিনি সেখানে পড়ে গেলেন আছাড় খেয়ে, এরপর আরেকজন মহিলা তাকে তুলতে গিয়ে তারও পা যেইমাত্র জলে গেছে তিনিও সেখানেই পিছলে চিৎপটাং। এ থেকেই বোঝা যায় যে ভগবানের অস্তিত্ব ওই জায়গাতে কতটুকু বেশি! এরপর আমরা আরো কিছু মন্দির ঘুরলাম মায়াপুরে, বিশাল বিশাল মন্দির, সেগুলো খুব সুন্দর কিন্তু সবগুলো মন্দিরেরই ভেতরে ফটো তোলা নিষিদ্ধ থাকায় আমরা ফটো উঠাতে পারিনি, সেটার জন্যে একটু দুঃখ ছিল। এরপর সব মন্দির ঘুরে আমরা চলে এলাম মায়াপুর ইসকনে। মায়াপুর ইসকনে এসে পুরোটা ঘুরলাম, ঠাকুর দেখলাম। আমার স্ত্রী কিছু মুখরোচক খাবার কিনে নিল। সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম গীতা ভবনে যেখানে সকালে টোকেন কেটেছিলাম প্রসাদ খাবার জন্য। সেখানে প্রসাদ আমরা খেলাম। খাবার পর সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা আবার আগের মতো করেই ফিরে চলে এলাম হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনে। হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে এরপর আমরা ফিরে এলাম আবার ত্রিপুরা ভবনে। সেদিন একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এসে গুগোল সার্চ করতে করতে হঠাৎ করে দেখলাম যে কালীঘাট মন্দির যেটা ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম সেটা আমরা যে ত্রিপুরা ভবনে আছি তার থেকে বেশি দূরে নয়। আমার স্ত্রী হঠাৎ করে বলল, দক্ষিণেশ্বর মাকে দেখলাম, কিন্তু এত কাছে এসে শক্তিপীঠ না দেখে চলে যেতে কেমন যেন লাগছে। আমারও মাকে না দেখে চলে যেতে মন চাইছিল না। তাই আমরা ঠিক করলাম যেহেতু পরদিন আমাদের নিউ জলপাইগুড়ির ট্রেনের টিকিট কাটা হয়ে গেছিল দার্জিলিং যাওয়ার জন্য। আমরা ঠিক করলাম পরদিন খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেই চলে যাব কালীঘাট মাকে দেখতে।
যেই ভাবা সেই কাজ। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা চলে গেলাম ভোর পাঁচটার দিকেই কালীঘাটে। সেখানে গিয়ে তাড়াতাড়ি মাকে দেখে আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম নিউ ধর্মতলা মার্কেটে কিছু কেনাকাটার জন্য যেহেতু দার্জিলিং যেতে হবে। সেখানে গিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী দুজনেই কেনাকাটা সারলাম নিজেদের জন্য। মায়ের জন্য একটা চাদর নিলাম আর আমার স্ত্রী আমার মায়ের জন্য একটা হাতঘড়ি নিল, বাবার জন্য তো ব্লেজার আগেই কেনা হয়ে গেছে। এরপর সেখান থেকে ত্রিপুরা ভবনে এসে আমরা লাঞ্চ সারলাম, রুম ছেড়ে চলে গেলাম হাওড়া রেলস্টেশনে। হাওড়া থেকে দুপুর ২:২৫ মিনিটে শতাব্দী এক্সপ্রেস করে রওনা হলাম নিউ জলপাইগুড়ি রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে। প্রায় রাত সাড়ে দশটার সময় গিয়ে পৌঁছালাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা একটা ট্র্যাভেল এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করে দার্জিলিংয়ের জন্য রওনা দিলাম ঐদিন ভোর চারটায়, যেতে যেতে প্রায় সকাল সাড়ে ছয়টা-সাতটা বেজে গেছে। আমাদের হোটেল আগেই বুকিং করা ছিল, সেখানে পৌঁছেই আমরা হোটেলে উঠলাম। হোটেলের রুমটা খুব সুন্দর ছিল, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছিল ঠান্ডায় ; প্রচন্ড ঠান্ডা ছিল সেখানে। রুমে পৌঁছেই যেই খালি পায়ে একবার ফ্লোরটা স্পর্শ করলাম ঠান্ডাটা যেমন পুরো ডিরেক্ট আমার মাথায় উঠে গেছিল।
এরপর আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে দুজনে তৈরি হয় নিলাম। গাড়ি অলরেডি চলে এসেছিল আমাদের সাইট দেখানোর জন্য। আমরা সেই গাড়িটাতে করে বাতাসিয়া লুপ, রামকৃষ্ণ মিশন, টি গার্ডেন, buddhist monestry, peace pagoda, tenzing rock অনেকগুলি জায়গা ঘুরে দেখেছিলাম, এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল বাতাসিয়া লুপ যার মধ্য দিয়ে toy train চলছিল, সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব মনোরম ছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ের বরফ খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সেখান থেকে। সেখানে আমি এবং আমার স্ত্রী কিছু ট্রেডিশনাল ড্রেস পরে ছবিও তুলে নিলাম আমরা দুজনে এবং একটা ফটোগ্রাফার দিয়ে কয়েকটা ফটো তুলে আমরা এগুলো প্রিন্ট করে আনলাম স্মৃতি হিসেবে, এভাবে সারাদিন ঘুরে এরপর আমরা বাইরে লাঞ্চ করে আবার ফিরে গেলাম আমাদের হোটেলে। কিছু সময় রেস্ট করে ঠান্ডা উপেক্ষা করেই আমি আর আমার স্ত্রী বেরিয়ে পড়লাম সন্ধ্যায় মলরোডের বাজারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। সেখান থেকে অল্প কিছু কেনাকাটা করে আমরা আবার ফিরে এলাম হোটেলে এবং এসে তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিয়েছিলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা ছিল বাইরে এবং ভেতরে সবখানেই। হোটেলে আমরা রুম হিটার ভাড়া করে নিয়েছিলাম। ওই রাতে রুম হিটারের কল্যাণে ভালোই কেটেছিল। পরদিন ভোর সাড়ে চারটার সময় আমরা ভাড়া করা গাড়িটা নিয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম টাইগার হিলের উদ্দেশ্যে। টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার যে দৃশ্য দেখা যায় তার ঘোর আজও কাটছে না আমার দুচোখ থেকে। নীল আকাশের বুকে সাদা বরফে আবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া প্রথম সূর্যের রশ্মির ছটায় সেজে উঠে এক অপরূপার সাজে। টাইগার হিল থেকে আমরা চলে এলাম ঘুম রেলস্টেশন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশন। শেষে এলাম মলরোডের কাছের মোটরস্ট্যান্ডে, সেখানে এজেন্টরা আগে থেকে গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল যাতে করে আমরা আবার পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি রেলওয়ে স্টেশনে।
এরপর নিউ জলপাইগুড়ি রেলওয়ে স্টেশন থেকে লোহিত এক্সপ্রেস করে আমরা সেদিন পৌঁছে গেছিলাম গৌহাটি। গৌহাটি পৌঁছে আমরা ওই রাত্রে থাকলাম। পরদিন সকালে অল্প একটু ঘোরাফেরা করে তারপর দুপুরে্র ট্রেন রানি কমলাপতি এক্সপ্রেস করে আমরা ফিরে এলাম ধর্মনগরে আমাদের বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা এত বড়ো, আমরা মোটামুটি ভালোই পর্যটন স্থান দেখতে পেরেছি, কিন্তু যে কথা বলতে হচ্ছে — পশ্চিমবঙ্গের রাস্তাঘাট এবং ট্রেনের সুবিধা অনেক বেশি এজন্য যারা ঘুরতে যায় তাদের এতটা বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না। তাছাড়া এই একটি ট্যুরেই আমরা আকাশপথ, স্থলপথ, মেট্রোপথ, রেলপথ, জলপথ সবকিছুর অভিজ্ঞতা নিতে পেরেছি। তবে সমস্যা হচ্ছে কী, একবার পশ্চিমবঙ্গ ঘুরতে গিয়ে এখন বাড়িতে আসার পর আমার আর কাজে মন বসছে না, আমার শুধু ইচ্ছে করছে আবার কোথাও একটু ঘুরতে যাই। দেখি ভগবান কপালে কী লিখে রেখেছেন !