আতঙ্কের রাত – সোমা গঙ্গোপাধ্যায়

আতঙ্কের রাত – সোমা গঙ্গোপাধ্যায়

আতঙ্কের রাত      (ছোটোগল্প)

সোমা গঙ্গোপাধ্যায়

একই মাটি, শুধু মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া, আলাদা করে রেখেছে মানুষকে। সীমা মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, সবই কপাল। কি ছিল আর হঠাৎ করে কি হয়ে গেল। ধর্ম নিয়ে ইদানীং মানুষের মধ্যে তীব্র ভেদাভেদ! আগে তো এমন ছিল না। সবাই মিলেমিশে বাস করছিল। হঠাৎ করে সব কিছু এক নিমেষে কী করে যেন পাল্টে গেল! কিছু কিছু জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, বাড়িঘরে আগুন, লুটপাট এসব শুরু হল। কিছু অমানুষ রাতারাতি শান্তির আবহাওয়াকে এক তীব্র আক্রোশে তছনছ করে দিল। প্রাণভয়ে কিছু নিরীহ মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে, কিন্তু কোথায় নিরাপত্তা? নিরাপত্তার অভাবে স্থানে স্থানে কেউ কেউ আক্রান্ত হচ্ছে। বড় অসহায় অবস্থা যেন।

সীমা অনেকদিন ধরেই তার স্বামী শঙ্করকে বলেছে — চলো, আমরা এখান থেকে চলে যাই। শঙ্কর মাথা নেড়ে বারবার একই উত্তর দিয়েছে — অন্য জায়গায় গিয়ে সহায়সম্বলহীন হয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? কী খাব? এখানে তো মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু আছে, দু’বেলা দুমুঠো ভাত জুটছে। ভেবে দেখো কথাটা।
— কিন্তু এভাবে কতদিন বাঁচা যায় ? প্রতি মুহূর্তে প্রাণ হাতে নিয়ে চলতে হচ্ছে আমাদের মত কিছু মানুষদের। কখন কি হয়ে যায় কে বলতে পারে! এই আমাদের জন্মভূমি!

শঙ্কর সবই বুঝতে পারে। এখন তাদের হয়তো নিরাপত্তা নেই। তবু সে সীমাকে ভরসা দেয় — দেখো, আমাদের এদিকটায় এখনো কিছু ঘটেনি। মানুষজনও ভালো, আপদ বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার মন বলছে, কোন বিপদ হবে না, তুমি দেখো।

সীমার মনের ভয় তবু যায় না। পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। শঙ্কর কাছের বাজারে সবজির ব্যবসা করে। সে কাঁচা সবজি আনতে প্রায়ই কিছুটা দূরে যায়। সে যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘরে ফেরে, সীমা উৎকন্ঠায় থাকে। শঙ্করের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই সীমার আজকাল খুব ভয় লাগে। মনে হয়, অন্ধকারে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রতিবেশী দু’এক ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলেও বাকিদের সঙ্গে সম্পর্ক ততটা নয় । যদিও এখানে, এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে হিন্দু-মুসলমান সবাই। বিভেদকামী শক্তি কখন কোথায় কোন্‌ সময়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, কেউ বলতে পারে না। কিছুদিন আগে একটা নিরীহ ছেলেকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে, মারধোর করে গাছে বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে কিছু বিভেদকামী উগ্র মৌলবাদীরা। ছেলেটার কোনো দোষ ছিল না। কেউ ভয়ে প্রতিবাদ করতেও সাহস পায়নি। ইদানীং কয়েকজন বড় মাপের নেতাও খুন হয়েছে। ভাঙচুর করা নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? সরকার নিরাপত্তা দিতে যেন হিমসিম। শান্তিপ্রিয় মানুষ চরম অশান্তিতে দিন কাটাচ্ছে।

সীমা তার স্বামীকে প্রতিদিন বাজারে যাবার সময় সাবধান করে দেয়, সে যেন জিনিসপত্র দরদামের সময় কারোর সাথে তর্কে না জড়ায়, কোন ধরনের বেফাঁস মন্তব্য যেন না করে, সাবধানে যেন চলাফেরা করে, একা একা যেন কোথাও না যায়। শঙ্কর বুঝতে পারে সীমার দুশ্চিন্তার কারণ। সে বউকে আশ্বস্ত করে সে সতর্ক থাকবে।

কিছুদিন পর শঙ্কর জানাল, তাকে আজ বিশেষ জরুরি কাজে যেতে হবে। ফিরতে দেরী হতে পারে। সীমা যেন চিন্তা না করে এবং দরজা বন্ধ করে ঘরে থাকে, অচেনা কেউ ডাকলে ঘর থেকে যেন বের না হয়। বেশি ভয় করলে, সীমা পাশের বাড়িতে গিয়ে বসতে পারে।
শঙ্করের কথা শুনে সীমার মুখ শুকিয়ে এল। সে কোনমতে বলল — আজকে না গেলে কি হয় না? আমার যে বড় ভয় করে।
— না গো, যেতেই হবে, শঙ্কর বলল।

শীতের দিনে বেলা তাড়াতাড়ি গড়িয়ে যায় আর নেমে আসে অন্ধকার, সাথে ঘন কুয়াশা। তুলসী বেদিতে প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে সীমার মনে হল কুয়াশাটা যেন ঝুপ্ করে নেমে এল। সে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যাবাতি দেখিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে একবার গেটের দিকে তাকাল, মনে হল কেউ যেন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাড়াতাড়ি সে ঘরে ঢুকে দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করে দিল। শঙ্কর তাকে সতর্ক করে বলেছিল অচেনা কেউ ডাকলে সাড়া না দিতে, দরজা না খুলতে। ইস্, দুপুরে যদি ঘুমিয়ে না পড়ত, তাহলে এতক্ষণে পাশের বাড়িতে গিয়ে বসে থাকতে পারত। মানুষজনের সঙ্গ পেলে হয়ত এতটা ভয় লাগত না। এখন আর কাউকে ডাকার উপায় নেই, ঘর থেকে বেরোনোও যাবে না। সত্যিই কি বাইরে কেউ তার ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে? ভয় আর উত্তেজনায় তার নি:শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। এখন যদি কেউ সত্যি সত্যি তাকে একলা বাড়িতে ঢুকে এসে ধরে? কী হবে তার?

হঠাৎ কিছু লোকের হইচই শুনতে পেল সীমা। তাহলে কি সে যা আশঙ্কা করছিল, তাই ঘটতে যাচ্ছে? কান খাড়া করে সে শোনার চেষ্টা করল, আওয়াজটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। তবে কি শেষ পর্যন্ত ওই উগ্র বিভেদকামী মৌলবাদীরা এখানেও এসে হানা দিয়েছে ? হে ভগবান ! এখন কী হবে? আশেপাশের বাড়িঘরের মানুষের কোন সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবে কি তারা ইতিমধ্যে কোনো নিরাপদস্থানে পালিয়ে গেছে? স্বামীও ঘরে নেই। এই চরম বিপদের সময় সে কাকে ডাকবে? কে-ই বা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তাকে বাঁচাতে আসবে? কিছু লোকের ভারী পায়ের আওয়াজ এখন শোনা যাচ্ছে খুব কাছেই। ভয়ে, আতঙ্কে সীমা প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।

মুহূর্তেই নিজের মন শক্ত করল সীমা। কিছু পোড়া গন্ধও যেন পাচ্ছে সে। সামনের দিকে দরজা খুলে বেরোনো যাবে না, বেরোতে হবে টিনের বেড়া ফাঁক করে, ঘরের পেছন দিক দিয়ে। হাতে সময় কম। নিজেকে নিজেই বাঁচাতে হবে। সে খাটের তলা থেকে শাবল বের করে, তারপর সেই শাবল দিয়ে দ্রুত হাতে টিনের বেড়া ফাঁক করে নি:শব্দে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘন কুয়াশায় স্পষ্ট করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। পা টিপে টিপে সে ঘরের পেছনের ঘন ঝোপ-জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। হাত পা যেন অবশ হয়ে আসছে। তবু, হাতের শাবলটাকে শক্ত করে চেপে ধরে সে আরো ভেতরে ঢুকে গেল। এত সহজে সে মরতে চায় না, সে বাঁচতে চায় — শান্তিতে, অনেক অনেক বছর ধরে। কারণ, তার দৃঢ় বিশ্বাস, খারাপ লোকের চেয়ে পৃথিবীতে ভালো লোকের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। তাই এই মুহূর্তে সে ভীষণ আশাবাদী হয়ে উঠল — তার কিছুই হয়তো হবে না, কারণ ভালো লোকদের জন্যই এক-একটা সভ্যতা টিকে থাকে।