দুঃস্বপ্ন – দেবাশ্রিতা চৌধুরী

দুঃস্বপ্ন – দেবাশ্রিতা চৌধুরী

দুঃস্বপ্ন      (ছোটোগল্প)     

দেবাশ্রিতা চৌধুরী

কাগজ কলম নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকেও সকাল থেকে একটা আঁচড় কাটতে পারেনি সোমদত্তা। সোমদত্তা রায়। বাংলা গল্প, কবিতা লেখায় মোটামুটি একটা জায়গা হয়তো করে নিয়েছে। কিন্তু সে নিজেই তা বিশ্বাস করে না। হা করে জানালা দিয়ে বাইরে যতটুকু দেখা যায়, সারাদিন তাকিয়ে বসে থাকে সে।

সোমদত্তা একসময় লিখেছিল:-
বন্ধ দরজার এপাশের নিস্তব্ধ দিনরাত তীব্র আতঙ্ক আর অবিশ্বাসের বিষাদে ভরপুর। গ্রিলঘেরা বারান্দার ওপাশে মাধবীলতার ঝাড়ে অকৃপণ বসন্ত এ বছর আর কাছে টানে না। ফুলের রাশি সবার অগোচরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে যায়। কেউ না দেখলে তার অস্তিত্ব কোথায়? এখন তার জায়গা নিয়েছে হাত বাড়িয়ে দেয়া নিমের কচি-যুবক পাতার সৌন্দর্য। এরকম হুতাশে ওরা মানুষকে বেশি কাছে টানে, এখানেও সেই “আমি””আমরা” জড়িত। মনে হয় ওরা আমাদের অসুখ ধুইয়ে নিরাময় করে দেবে, জানি একথা ঠিক নয়। কিন্তু বিপন্ন মানসিকতায় ঠিক ভুল বিচার না করে মন কিছু একটা কাউকে একটা আঁকড়ে ধরতে চায়।

মাঝে মনে হয় একটা দুঃস্বপ্নে হারিয়ে ফেলেছে সময়। জীবন একদিন খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে শিখিয়েছে, আর এখন বদ্ধঘরে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা। তাই এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে বুক — এবারের মত বেঁচে যাবে তো এই খড়কুটোর সংসার! প্রত্যেকটি উড়তে চাওয়া সুতো আঁকড়ে শক্ত করে গিঁট দেওয়ার শক্তি জুগিয়ে চলার এখন জীবন। বন্ধ চোখের তারায় গণকবরের ছবি আরো একবার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে সচল করে রাখে। প্রাথমিক ভয়ের পর ধারাবাহিকভাবে আসে আতঙ্ক তারপরে বিষণ্ণতা। ভরদুপুরে শূন্য রাজপথ আরো একবার মেসোপটেমিয়া মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার পথে এগিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। প্রাণপণে ফিরে এসে আবার ডুব দেওয়া বিষণ্ণতা ও নির্ঘুমে।

আবদ্ধ সময় একদিকে জীবনের স্থিতিশীলতায় আকর্ষণ বাড়ায় আরেক দিকে পরস্পরের প্রতি অনাগ্রহ, বিতৃষ্ণা দূরে থাকার প্রচেষ্টা প্রজন্মের পঙ্গুত্বের ভয় বাড়ায়। এতদিনের বয়ে চলার ধারা কি তবে ভিন্নমুখী পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে চলেছে ? হয়তো এই সময়ের মধ্যে চলতে চলতে ভিন্নধর্মী একটা জীবনধারা প্রভাবিত করে চলেছে নিজেদের অগোচরেই। এই দিনগুলোর শেষে আর কি ফেরা হবে সেই আগের মতো খোলামেলা সময়ে, যখন মানুষ মানুষের হাতে হাত রেখে উষ্ণতা খুঁজত! স্পর্শ করার মধ্য দিয়ে অনুভব করত নৈকট্য! হয়তো আর ফেরা হবে না সে পথে। একটি ভয়ংকর জীবাণু মানুষের মধ্যে ব্যবধান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। অল্প কিছু মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ বা লাভের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থের ফলশ্রুতিতে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। এর ফাঁকে জন্ম নিয়েছে এই কালরূপী অনুজীব। নিজের সর্বনাশের জন্য দায়ী মানুষ নিজেই। প্রবল আত্মবিশ্বাসী হয়ে বছরের পর বছর ধ্বংস করেছে পরিবেশের ভারসাম্য। বিপর্যস্ত হয়েছে জলবায়ু, পৃথিবীর উষ্ণায়ণ, অরণ্য বিনাশ – তার ফলশ্রুতিতে উপর্যুপরি আক্রান্ত মানবসভ্যতা। উষ্ণায়ণ সরাসরি আঘাত করে কমিয়েছে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, সেই সুযোগে জীবাণু অবিরত পাল্টে ফেলছে নিজের প্রকৃতি, হয়ে উঠেছে আরো শক্তিশালী আরো বেশি আক্রমনাত্মক।

এই ভয়াবহ অতিমারী, মৃত্যুর মিছিলে আরও একটা দিক পাশাপাশি উন্মোচিত হয়েছে। মানবতাবোধ আস্তে আস্তে সজাগ হচ্ছে। পরস্পরের দুঃখকে আপন করে নিতে শিখছে মানুষ, নতুন প্রজন্ম। দূর বিদেশে অথবা স্বদেশে অন্নবস্ত্রের নিরাপত্তার সন্ধানে যারা ছিল তারাও কোন বিপদ গ্রাহ্য না করে, মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে আপনজনের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টায় সামাজিক দূরত্বের ভয় অতিক্রম করে ফেলে। তারা নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে মানবাধিকারের কথা।

গতির সাথে সাযুজ্য রাখতে গিয়ে চারপাশের অনেক কিছু চোখ এড়িয়ে গেছে এই দীর্ঘজীবনে। এখন সকাল হয় পাখির ডাকে, সবুজের নিবিড় স্নিগ্ধতায়। এতদিন এরা সব কোথায় ছিল! আসলে ওরা ছিল, আমাদের অপ্রয়োজনীয় কাজে অতিরিক্ত মনোনিবেশে চোখ খোলা থেকেও বন্ধ ছিল। প্রকৃতি আজ হয়তো তার প্রাপ্য আদায়ে অনড়। অনেক সহ্য করেছে এই ধরিত্রী বুক পেতে মানবসমাজের অন্যায় অত্যাচার। তারা ফলশ্রুতিতে আগামীর পৃথিবীর বাসিন্দা একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চলেছে। হয়তো ভবিষ্যতে মানুষ ক্ষার জল আর মুখোশ-এর করায়ত্ত্ব হয়ে যাবে, দূরত্ব হবে তাদের জীয়নকাঠি। শত্রু দৃশ্যমান হলে তার সাথে যুদ্ধটা সহজ কিন্তু অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সরঞ্জামবিহীন যুদ্ধ ভয়াবহ তো বটেই, প্রায় অসম্ভব

যুদ্ধ, প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক শক্তি সংগ্রহ, হিংসাদীর্ণতা সব সত্ত্বেও আমাদের “ভুবনগ্রাম” এক ছাদের নিচে আসবে একটি অতিমারীকে কেন্দ্র করে তা কি কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলাম! আজ থেকে ছ’মাস আগেও তার অসম্ভব ছিল। সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে মানুষের স্থান, চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা একদিন জয়ী হবে অনুজীবিদের মারণাস্ত্রের বিপরীতে। হবেই হবে। এইসব অনুজীবের আক্রমণ বারবার প্রতিহত করতে পেরেছে মানুষ, মানবসভ্যতা ধ্বংসের চেষ্টায় বিফল হয়েছে অসংখ্যবার এইসব ক্ষুদ্র অনুজীব, নানা রূপে, নানা ধরনে। এবারও অতীতের মতোই জয়ী হবে মানুষ। অর্দ্ধমৃত নগরীর বুকে একরাশ চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে হাত ধরাধরি করে নতুনভাবে প্রাণসঞ্চারে এগিয়ে আসবে একঝাঁক তরুণ তারকা।..

কিন্তু শুধু গল্প কবিতায় এরকম হয়। সোমদত্তা আজ শূন্য হয়ে পেছনের দিনগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখে। দুর্বোধ্য দাগে ভরিয়ে রাখে খাতার পাতা, দেওয়ালের আনাচ কানাচ। সবাই না হোক মানুষ জয়ী হয়েছে, হারিয়েছে সর্বস্ব সোমদত্তার মতো কেউ কেউ, ভাবতে গেলে মাথা ঝিমঝিম করে। সবকিছু যেন খেই হারিয়ে ফেলে। তাহলে কি ওরা যা বলে তাইই সত্যি ?

অ্যাসাইলামের মাসি লাঠি তোলে – তুই আজ খুব মার খাবি আবার। ওঠ, স্নান করতে যা।
ভয়ে কুঁকড়ে যায় মেয়েটি। শরীরের কালশিটে দাগগুলো ওকে ভয়ে কুঁকড়ে মার খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আজ ঠিক তখনই একটা রোমশ হাত মাসির হাতের লাঠি শক্ত করে চেপে ধরে।
সোমদত্তা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে — কে তিনি? যেন দেখেছি কখনো!

একটা বাংলা খবরের কাগজে মহামারী নিয়ে সে লিখেছে অনেক রিপোর্ট। তারপর একদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। এ যুদ্ধ সে যুদ্ধ নয়। মরণের বিরুদ্ধে জীবনের যুদ্ধ। এপথ সেপথ চলতে চলতে আজ সোমদত্তা নিজের সামনে দেখা মৃত্যুর সংখ্যা গুনে গুনে হিসাব মেলাতে পারছে না। এ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই, ভাবনা নেই, ঠিকানা নেই। কে বা কারা দিয়ে গেছে এখানে তাও মনে নেই। সোমদত্তা থেমে গেছে কয়েক বছর আগে। দিন রাত মুহূর্ত সব থমকে আছে একই জায়গায়।

আজ কি তার আপনজন কেউ খুঁজে পেয়েছে তাকে? না হলে সোমদত্তা প্রবল ভরসায় ঐ দুটি হাতের মুঠোয় এলিয়ে পড়ে কেন!