
ভারতে এক মিনি ইসরায়েল
সদানন্দ সিংহ
আপনি জানেন কি, ভারতের ভেতরে এক মিনি-ইসরায়েল আছে যেখানে এক ঝলকে দেখলে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জগত বলে মনে হবে আপনার! যেখানে আপনি পাহাড়ের শীতল বাতাসে হারিয়ে যেতে পারেন এবং ইসরায়েলি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাও পেতে পারেন। যে জায়গার কথা বলা হচ্ছে তা হল হিমাচল প্রদেশের কাসোল, যা আজ মিনি-ইসরায়েল নামেও পরিচিতি লাভ করেছে।
কাসোলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই যে জিনিসটি আপনার নজরে পড়বে তা হল এখানে ইসরায়েলি সংস্কৃতির এক ঝলক। আপনি এখানে ইসরায়েলি ক্যাফে, হিব্রু ভাষায় লেখা বোর্ড এবং প্রচুর বিদেশী পর্যটকদের দেখতে পাবেন। প্রকৃতপক্ষে, প্রতি বছর ইসরায়েল থেকে হাজার হাজার পর্যটক ভারতে বেড়াতে আসেন এবং তাদের মধ্যে একটি বিরাট সংখ্যক পর্যটক কাসোল ভ্রমণ করেন।
হিমাচল প্রদেশের উপত্যকায় লুকিয়ে থাকা এই ছোট্ট পাহাড়ি স্টেশনটি তার অনন্য মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। আপনি যদি প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চান এবং আপনার জীবনের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ মুহূর্তগুলি উপভোগ করতে চান, তাহলে কাসোল আপনার জন্য একটি দুর্দান্ত গন্তব্য। এই সুন্দর জায়গায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মনে হবে যেন আপনি এক জাদুর জগতে পা রেখেছেন।
কাসোল কীভাবে যাবেন
কাসোল হিমাচল প্রদেশের কুলু জেলায় অবস্থিত এবং মানালি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নিকটতম বিমানবন্দর হল ভুন্টার বিমানবন্দর, যা কাসোল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখান থেকে আপনি ট্যাক্সি বা লোকাল বাসে করে কাসোল পৌঁছাতে পারেন। যদি আপনি ট্রেনে আসতে চান, তাহলে পাঠানকোট হল নিকটতম বড় রেলস্টেশন যা কাসোল থেকে ৩৫৯ কিমি দূরে অবস্থিত। সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে করে আপনি কাসোল পৌঁছাতে পারেন। এছাড়াও দিল্লির কাশ্মিরি গেট থেকে সরাসরি বাস আছে, যাতে সময় লাগে ১৩ ঘন্টার মত।
কাসোলে দর্শনীয় স্থান
পার্বতী নদী ও উপত্যকা: কাসোলের উপত্যকা এবং মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া পার্বতী নদীর শান্ত ও স্নিগ্ধ স্রোত মুহূর্তের মধ্যেই আপনার ক্লান্তি দূর করে দেবে। নদীর তীরে বসে সময় কাটানো, ধ্যান করা অথবা প্রকৃতির ভেতরে ডুব দিয়ে লাভ করবেন এক অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা। এছাড়া কাসোল নেচার পার্ক যা নদীর ধারে অবস্থিত একটি শান্ত পার্ক। মালানার উপরে অবস্থিত একটি লুকানো রত্ন হল ম্যাজিক ভ্যালি যা ওয়াইচিন ভ্যালি নামেও পরিচিত।
তোশ গ্রাম এবং ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকিং: তোশ গ্রাম হল পার্বতী উপত্যকার শেষ গ্রাম, যেখান থেকে বরফাবৃত পাহাড়ের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী হন, তাহলে কাসোল থেকে আপনি তোশ, মানিকরণ এবং ক্ষীরগঙ্গার মতো জায়গায় ট্রেকিং করতে যেতে পারেন।
চালাল এবং অন্যান্য গ্রাম: কাসোল থেকে ৩০ মিনিটের হাঁটা পথে যাওয়া যায় চালাল গ্রামে, যা শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত। এছাড়া আছে পুলগা গ্রাম যাকে ‘পরী বন’ বলা হয়, যা শান্ত ও মনোরম পরিবেশের জন্য পরিচিত। আর মালানা গ্রাম হচ্ছে এক অনন্য সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত একটি প্রাচীন গ্রাম।
মনিকরণ: পার্বতী নদীর তীরে কাসোল থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, ছোট শহর মণিকরণে মণিকরণ সাহেব নামে একটি গুরুদ্বার রয়েছে এবং গুরু নানক স্বয়ং এখানে এসেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই শহরটি হিন্দু এবং শিখ উভয়ের জন্যই একটি তীর্থস্থান। এই শহরটিতে গরম জলের ঝরনা ছাড়াও আপনি অনেক গরম জলের পুকুর দেখতে পাবেন। এছাড়াও, গুরুদ্বারে লঙ্গর উপভোগ করুন যা কোনও জ্বালানি ব্যবহার করে নয় বরং শুধুমাত্র ঝরনার গরম জলের সাহায্যে তৈরি। বাজারে চাল সহ ছোট কাপড়ের থলি পাবেন যা ঝরনার গরম জলে রান্না করা যায়। কাসোল এবং বর্ষায়নির কেন্দ্রস্থল, মণিকরণ একটি অবশ্যই দেখার জায়গা।
কাসোল বাজার, ক্যাফে কালচার এবং ইসরায়েলি খাবার: কাসোল বাজার হল হস্তশিল্প, গয়না, ও স্থানীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য এটি একটি ব্যস্ত জায়গা। এছাড়া কাসোলে আপনি কিছু দুর্দান্ত ক্যাফেও পাবেন, যেখানে ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি আপনি শাকশুকা, ফালাফেল, হুম্মাস এবং পিটা ব্রেডের মতো ইসরায়েলি খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।
স্থানীয় সংস্কৃতি এবং হস্তশিল্প: কাসোলে ঘুরে বেড়ানোর সময়, আপনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে পারেন এবং তাঁদের তৈরি পশমী পোশাক, কাঠের ভাস্কর্য এবং অন্যান্য হস্তশিল্প কিনতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
থাকার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের এবং আরামদায়ক জায়গার জন্যে এখানে আপনি বাজেট অনুসারে হোটেল এবং গেস্ট হাউস পাবেন। ব্যাকপ্যাকার হোস্টেল থেকে শুরু করে নদীর ধারের কটেজ পর্যন্ত, এখানকার প্রতিটি জায়গায় শান্তি ও প্রশান্তির আভাস নিয়ে থাকতে পারবেন।
যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়
কাসোল সারা বছর ঘুরে দেখার জন্য একটি দুর্দান্ত জায়গা, তবে সবচেয়ে ভালো আবহাওয়া মার্চ থেকে জুন এবং তারপর অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে। মার্চ থেকে জুন সেরা সময়, এই সময় আপনি সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকদের দেখতে পাবেন যার ফলে এখানে একটু ভিড় হয়। মে মাস ট্রেকিং, রাত্রিকালীন পার্টি বা স্থানীয় উৎসবের জন্য সবচেয়ে ভালো। এইসময় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় না। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময় বর্ষাকাল, কাসোল ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময় নয়, ভূমিধস এবং রাস্তা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে অফ-সিজন হওয়ায় কাসোল ভ্রমণ সস্তা হয়। ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে ঠান্ডা থাকে, তখন বেশিরভাগ রাস্তা অবরুদ্ধ এবং দুর্গম হ্য়। তবে অক্টোবর এবং নভেম্বর মাস মনোরম এবং খুব বেশি ঠান্ডা থাকে না।
সতর্কীকরণ
ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় গরম জামাকাপড় এবং জিনিসপত্র সঙ্গে রাখুন। আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী একটি মেডিকেল কিট সঙ্গে রাখুন। ভ্রমণের সময় সরকারি পরিচয়পত্র অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। ট্রেকিং করার সময় ভালো ট্রেকিং-জুতা ব্যবহার করুন । স্থানীয় সম্প্রদায় এবং এর রীতিনীতিকে অসম্মান করবেন না। পাবলিক প্লেসে প্লাস্টিক বর্জ ফেলবেন না। গভীর রাতে ক্যাম্পের বাইরে ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন। গুরুদ্বারা মণিকরণ সাহেবে খাবার নষ্ট করবেন না। কোনও পবিত্র স্থানের কাছে মদ্যপান করবেন না।