
মেয়েজন্ম (ছোটোগল্প)
সুদীপ ঘোষাল
বেশ ছিমছাম বাগান। হরেক রঙের ফুল। বিনোদ এর বাগানে দুটি ফুল খুব প্রিয়। সুজন ও সীমা দুই ভাইবোন।
সীমা প্রথম সন্তান। সে মেয়ে। যখন সে জন্মগ্রহণ করে বিনোদ রাগে দুটো কাঁচের গ্লাস ভেঙেছিল।
ঘর সাজাতে লাগে ফুল, সংসার গোছাতে আর রান্না করার জন্য জন্ম নেয় মেয়েরা, মোটামুটি এটাই বেশিরভাগ মানুষ মেনে নেয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।
সীমা বড় হতে শুরু করে প্রাকৃতিক নিয়মে। তার যখন পাঁচবছর বয়স তখন জন্ম নেয় সুজন। শাঁখ বাজে, উলুধ্বনি শোনা যায়।বিনোদ দুজোড়া পাঁঠা মানসিক করে আর বলে, আমার ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রাখো বাবা।
আসলে কে বাঁচাবে, কে মারবে আমরা কি জানি ? তবু বিনোদ বলে, মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিলেই হবে। ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে।
সীমা বাবার জ্বর হলে রাতভর সেবা করে। এখন সে ক্লাস টুয়েলভ-এ পড়ে।
বিনোদ মেয়ে ছাড়া এক পা চলতে পারে না। সকালে উঠে, ব্রাশে মাজন লাগানো, গরম জলে স্নানের ব্যবস্থা করা, আসন পাতা, খাবার দেওয়ার পর ঘর গোছানো, কাপড় জামা গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি সীমার নিত্যকর্ম।
তারপর সুজন বড় হয়। সে ডাক্তারি পড়ে। তার থাকা খাওয়ার পাকা ব্যবস্থা করেছে বাবা বিনোদ। ছেলের জন্য খরচ করতে বিনোদের দরাজ দিল।
সীমা কলেজে উঠে তার পড়া ছেড়েছে।
সীমা বলত, আমি আরও পড়ব বাবা।
— দেখ মা, ভাইকে ডাক্তারি পড়াচ্ছি। আমার সামান্য আয়। দুজনকে পড়াতে পারব না।
— তাহলে থাক বাবা, তোমার কষ্ট হবে।
তারপরের ইতিহাস খুব সহজ সরল নয়। সীমার বিয়ের ব্যবস্থা হলো এক মুদি দোকানের মালিকের সঙ্গে। গ্রামের মুদিখানা। সরকারি চাকরি যে ছেলেরা করে, তাদের পায়াভারি হয়। অতএব বিনোদ সহজ রাস্তা দেখে।
বিনোদের বন্ধু দিনেশ বলে, মেয়েটাকে জলে ফেলে দিলি বিনোদ ?
— আমার দিকটাও দেখ।
দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে। পৃথিবীর যতকিছু মায়া বনবন করে পাক খায়। জীবনে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত তো আছেই।
বিনোদের ছেলে সুজন ব্যাঙ্গালোরে থাকে। ওখানে ওর সংসার উচ্ছল নদীর মত।
এপারে তরি ঠেকে বালিতে। তরি এগোয় না পিছোয় না। বিনোদ বুড়ো হয়। তার বউ গত হয়েছে। এখন সীমা ভরসা।
সীমা তার অভাবের সংসার সামলে বাবার জন্য জামা আনে, প্যান্ট আনে, হরলিক্স, মুদিখানার মাল মায় চাল পর্যন্ত এনে দেয় বাবাকে।
বাবাকে দেখাশোনার জন্য একটা লোক রাখে। সে সীমার বাবাকে রান্না করে দেয়, সেবা করে।
এখন সীমার বাবা পরমুখাপেক্ষী। তবুও তার মুখে সবসময় ছেলের নাম, সুজন কবে আসবে, সুজন জমি আর টাকাগুলো নিজের নামে করে নিক। ওকে একবার আসতে বল সীমা।
সীমা বলে, ভাই এর কোনো অভাব নেই।
— তবু ছেলেকে দিতে পারলে বাবা মায়ের শান্তি। ও তুই বুঝবি না।
সীমা ভাবে, যখন মা বেঁচে ছিল তখন বাবা আমাকে কত ভালোবাসত।
বাড়ির মেয়েটা ছিল খুব আদরের। মেয়ের বাবা সকালবেলা গাছে জল দিতেন। ধীরে ধীরে গাছটা ডালপালা মেলে, ফুল ফোটে। তারপর ফুল পরিবার থেকে পৃথক হয়।
মেয়ের মা বলতেন, বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ে ‘পর হয়ে যায় গো। গঙ্গায় ফুল বিসর্জনের মত ভেসে যায় মায়া।
বাবা বলতেন, সে কি গো ? নিজের মেয়ে বলে কথা। যতই হোক, আমাদেরই দেহের অংশ তো।
এবার মেয়ে এসে বাবাকে বলে, বাবা তুমি তো ফুল ভালোবাসতে। আমার স্বামীও তো চাকরি বাকরি করে না। আমাকে তোমার জমি জায়গা কিছুটা দাও।
বাবা বলেন, বিয়ে হলে মেয়ে পর হয়ে যায়। এটা তোর ভাইয়ের জন্য থাকুক।
মেয়ে বলে, আমার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করবে বাবা ?
বাবা দু চার হাজার টাকা মেয়ের হাতে দিয়ে বলেন, আর ভাগ চেয়ো না, তোমার বদনাম হবে। সুজনকে ডাক একবার এখানে। ওর নামে জমি জায়গা লিখে দিতে না পারলে আমি মরেও শান্তি পাব না।