রমাকান্তর ডাইরি – তাপসকিরণ রায়

রমাকান্তর ডাইরি – তাপসকিরণ রায়

রমাকান্তর ডাইরি    

তাপসকিরণ রায়

[পৃষ্ঠা ৩-৫ থেকে]
জীবনের কাহিনিগুলি কিন্তু এক জাগায় এসে মিলে মিলে যায়। অনেক ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখলাম। অবশ্য এটাও ঠিক, কাহিনি কত আর জন্মাবে, জীবনধারার প্রেমিক-প্রেমিকার শুরুই প্রধান কাহিনি, তার প্রেম, বিরহ, বিচ্ছিন্নতা এ সবই তার মূল ধারা। এ ছাড়াও আছে বিয়োগ ব্যথা, ধর্ষণ কথা, জীবন দর্শনের বড় বড় ভাব টেনে মনকে গুলিয়ে দেওয়াও সাহিত্যের আর একটা দিক আছে।

কবিতা নিয়ে আজকাল ভীষণ ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কেউ কেউ অতি গভীরের লেখায় মত্ত — এ ধরনের লেখার বুঝদার অনেক কম। পরিমিত সংখ্যায় এ ধরনের কবিরা নিজেরাই এখানের পাঠক। ওঁদের ধারণা কবিতার মর্ম মূল্যই ওঁরা পাল্টে দেবেন। সচরাচর প্রাক্তন ওসব মিল বুজরুকিতে ওঁরা বিশ্বাসী নন। আবার আর এক ধরনের কবি আছেন, তাঁরা নাকি অনেকটা সোজাসুজি দেখতে ভালবাসেন। ওরা নাকি আবার ফিরে আসছেন ! তাই বুঝি আমরা আবার দেখতে পাই — মিলের কবিতা, ছড়ার কবিতা।
এক দিকে দেখি —

ঘুম নেই জেগে আছি
তোমার শিরা উপশিরা বেয়ে
এক উর্বরা ভূমি নেমে গেছে
মধ্যবলয়।  
জলদ মেঘের মত বর্ষা নামে
বারবারের তবু সেই সোঁদা গন্ধ ভাল লাগে।
জানলা গলিয়ে তোমায় আবার দেখতে চাই লাল ওড়নায়
পলাশের নেশা তখনও কাটেনি
শিমুলের চটক লালে নেমে যেতে যেতে
বসন্ত ধর্ষিতা একটা দিন–  
এমনি এক মেঘলা ছায়ায়
বিশ্বাসের বিপ্লব ঘটেছিল–
বিশ্বাসকে হনন করে সেদিন
অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল একটি প্রেমিকা।
এ কথা আমরা কেউ জানি না।

কবিতা লিখে ফেললাম কি ? কিন্তু জানি, সে গভীর লেখা লিখতে পারিনি। তবে ডাইরির পাতায় নিজস্ব লেখা হয়ে এটা থাকলে ক্ষতি তো কিছু নেই। এবার দেখা যাক আজের টানা-পোড়েনের মাঝে ফিরে আসা ছড়া কবিতা লেখার চেষ্টা করে–

ভালবাসি ভালবাসি তোমার পলাশ ঠোঁট
পলাশ তলায় শিমুল তলায় দেখো
বসন্ত প্রেমিকের এক জোট !


–এই ফোট্ !
আমার লীলা, তোর শীলা,
আবার তোর লীলা, আমার শীলা,
যদি লাগে মার না হয় আর এক ঘোঁট !

বসন্ত আজ মাতোয়ারা
প্রেমের রঙে আত্মহারা !
আয় তোরা কি রং দিবি,
যা আছে মোর সবটা নিবি,  
থাক না ও সব আত্মকথা,  
আওড়া প্রেমের বুলি
ভুল করে তুই আমার সাথে
না হয় একবার শুলি !  

আহা রস টইটম্বুর এ সব কবিতা-ছড়া পড়তে কিন্তু ভালই লাগে। সাধারণের  জন্যে ভাব-ভাষা-ভাবনা থাকে। সাধারণ জনগণ আম বোলের গন্ধে মাতোয়ারা হতেই পারে। তাই গভীরে আরও গভীরে ঢুকে যাবার জন্যে মদ গাঁজা যা রইলো তাই যথেষ্ট।
তবে কেন তোমার নতুন সৃষ্টির কবিতা, কেন ভাব ভাষার গভীরতা নিয়ে এত গবেষণা ?
কেন পান্থ ! ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ ? উদ্যম বিহনে কার পূরে মনোরথ ? কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে ?
দেখুন না কেমন প্রাণে গিয়ে ঘাই মারছে ?
এর চে টেলিভিশনগুলি বুঝি ভাল। একই সিরিয়াল বছরের পর বছর কাটিয়ে যাচ্ছে। দেখো তাতে কি নেই ? একশ লোকের জীবনী ভোরে রাখা থাকে — রিকশাওয়ালা থেকে বিদেশী বাবুদের অধিকার পর্যন্ত দেখিয়ে দেয়। এটা ছাড়বেন, ওটা খাবেন। এত লজ্জার কি আছে — ওই যে কথা আছে না — লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়। এ সব গুণাগুণ থাকলে তবেই তো সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব পর হয়।  

তাই গা ভাসাও। গরিষ্ঠ দলের দিকে মাথা ঝোঁকাও, অন্তত সামনা সামনি। তারপর নিজের মত নিজের মনকে বুঝ দাও–তাতে নাকি জীবনকে অনেক হাল্কা করে নেওয়া যায়।
নাটকের মাঝ থেকে নাকি জীবনকে ধরা যায়। শেক্সপীয়ার বলেছেন, টি ওয়ার্ল্ড ইজ টি স্টেজ। বলা যায় জীবনের মধ্য দিয়েই নাটকের সৃষ্টি হয়। জীবনের এক দিক ভাঙতে থাকে আবার অন্যদিক গড়তে থাকে। আর এভাবেই তো জীবনের ভাঙা-গড়া চলতে থাকে। তাই বন্ধুরা ! তোমরা বেশি ভেবো না — সমাজের সাথে মিশে যেতে পারে জীবনের কথা। তার মধ্যেই ঘটবে উত্থান ও পতন। সব সম্ভব, জীবনচরিত্র থেকে খসে পড়ছে নতুন নতুন অভিলেখ। জুয়ার আড্ডা থেকে দুঃশাসনের ল্যাঙট খোলা দেখা যেতেই পারে !
আজ চরম অবস্থা ছেড়ে অনেক গৃহস্থ দেখো সুখে নিমজ্জ্মান। ওরা নিজের গণ্ডিতে বসে আছে, ওরা দুঃখের উত্তাল তরঙ্গ থেকে দূরে সরে সরে নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। তবে হ্যাঁ দারিদ্র্য এক পাপ বটে — তাই বুঝি মাঝে মাঝে বড় বড় নেতাদের মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় — দরিদ্র নির্মূল করতে হবে –। এটা ভাষাগত ভুল হলেও চরম সত্য !

ধরো আর মারো নিয়মে দেশ চলে না. আবার সব জায়গায় সব কিছুরই সাক্ষী দিয়ে আদালতি বিচার চলে না। কিংবা শুধু ভাব-ভাবনা দিয়ে দেশ চলে না। সাহিত্যের বদল মানুষের লেখনীর ধারে- অধারে এগিয়ে চলতেই পারে ! আমরা শুধু দর্শক নই — আমাদের মত ভাল, মন্দ, দুষ্ট, চরিত্রবান, চরিত্রহীন নিয়ে এই দেশ। এই পৃথিবীটাও তাই বুঝি গড্ডালিকা প্রবাহের মত নিজেকে সামাল দিতে দিতে দেখতে দেখতে সামনের দিকে চলতে চলতে নিজের চারদিকে মাতালের মত ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।