যে গল্পের শেষ নেই – চেখভ

যে গল্পের শেষ নেই – চেখভ

যে গল্পের শেষ নেই           (ছোটোগল্প)

চেখভ

(রাশিয়ান গল্প, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: বিজয়া দেব)


সে অনেক আগের কথা, এক রাতে রাত দুটো বেজে যাওয়ার ঠিক পর পরই আমার রাঁধুনি, ফ্যাকাসে মুখে উদ্বিগ্ন চেহারায় অপ্রত্যাশিতভাবে আমার পড়ার ঘরে ছুটে এল এবং আমাকে জানাল, মাদাম মিমোতি, বৃদ্ধা মহিলা, যে আমার লাগোয়া বাড়ির মালকিন, বসে আছে তার কিচেনে। সে কাতর হয়ে আপনাকে ডাকছে স্যার…। রাঁধুনি হাঁফাতে হাঁফাতে আরো বলল — তার বাড়ির ভাড়াটে খুব খারাপ ঘটনা ঘটিয়েছে স্যার, সে নিজেকে গুলি করে নিজেকে ঝুলিয়ে রেখেছে।
— তাতে আমি কী করতে পারি! তাকে বলো ডাক্তার অথবা পুলিশের কাছে যেতে।
— সে কী করে যাবে স্যার, তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, সে জড়োসড়ো হয়ে চুল্লির পাশে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। আপনি একটিবার ঘুরে আসুন স্যার। এটা খুব ভালো হবে।

অগত্যা আমি আমার কোট ও হ্যাট লাগিয়ে মাদাম মিমোতির বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। যে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেটা খোলা ছিল। এটার পাশে দাঁড়িয়ে আমি থামলাম, ভাবছিলাম কোন দিকে যাবো! আমি উঠোনের দিকে ঢুকে পড়েছিলাম এবং আমি যে ঢুকেছি তার জন্যে কোনও বাড়িরক্ষকের বেল বাজানোর শব্দ অনুভব করলাম না। আমি জীর্ণ বারান্দার ওপর দিয়ে সদর দরজার সামনে গিয়ে দেখলাম দরজা খোলা। আমি ঢুকে পড়লাম। সেখানে আলোর কোনও আভাস ছিল না, কালো পিচের মতো অন্ধকার, হালকা ধূপের গন্ধ পেলাম। আমি অন্ধকারে ভেতরে ঢোকার দরজা কোথায় রয়েছে সেটি খুঁজে পেতে পথ হাতড়াচ্ছিলাম, সেই সময় আমার কনুই শক্ত কিছুতে ঠেকে গেল, মনে হল লোহার তৈরি একটা কিছু হবে। এবার অন্ধকারে হোঁচট খেলাম একটা বোর্ডের সাথে যেটি মেঝেতে ফেলা ছিল। শেষ পর্যন্ত দরজা পাওয়া গেল যা মোটা ছেঁড়া পশমী কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, এবার আমি একটা ছোট হলঘরের ভেতর ঢুকে পড়লাম।
এই মুহূর্তে আমি কিন্তু কোনও রূপকথা লিখছি না, এবং পাঠককে চকিত করে তোলার কোনও উদ্দেশ্যও আমার নেই। কিন্তু যে ছবি আমি প্যাসেজ থেকে দেখছিলাম তা কোনও সাধারণ ছবি নয়, একমাত্র মৃত্যুগন্ধী পরিবেশ সেই ছবি আঁকাতে পারে। এখান থেকে একেবারে সোজা দেখা যাচ্ছে একটা ছোট ড্রয়িংরুম। তিন/পাঁচ কোপেকের মোমবাতি একই সারিতে জ্বালানো, তা থেকে ম্লান আলো পড়েছে ধূসর শ্লেট রঙা ওয়ালপেপারের ওপর। ছোট্ট ঘরটির ঠিক মাঝখানে একটা কফিন দুটো টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা। দুটো মোমবাতির আলো শুধুমাত্র আলো ফেলতে সক্ষম হয়েছে কালচে হলুদ মুখের ওপর, যার মুখ অর্ধেক হাঁ করা, খাড়া তার নাক। মসলিনের কাপড় ইতস্তত ছড়ানো এবং তা সারাদেহের সাথে মিশে আছে, তার পাশে গিয়ে চোখে পড়ল মোমের ক্রশ হাতে নিয়ে দুটো নিথর হাত দু’পাশে ঝুলে আছে। আধো আলো-আঁধারির ছোট্ট ড্রয়িংরুমের প্রতিটি কোণ, কফিনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তি, কফিন, এই ঘর যেন নিজেই এক কবরখানা।
কী আশ্চর্য! আমার বাড়ির পাশেই এই প্রেক্ষিত অনেকটা দূরের, একেবারেই বিপরীতধর্মী, অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত, হতবাক করার মতোই। কিন্তু ভাড়াটে লোকটার আত্মহত্যার ব্যাপারটায় এত তাড়াহুড়ো কেন? এই বাড়িতে আবাসিক ব্যক্তিটির সম্ভবত নিজেকে ঝুলিয়ে দেবার অথবা নিজেকে গুলি করে মেরে ফেলবার সময়টুকুও নেই। আবার এদিকে কফিনটাকেও তৈরি করে রাখা হয়েছে!
আমি চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। বাঁদিকে কাচের প্যানেল দেওয়া একখানি ঘর আছে, ডানদিকে পায়া ভাঙা একটি জীর্ণ ফারের কোট ঝোলানো রয়েছে….
— জল! – আর্তস্বর শুনতে পেলাম।
এই আর্তস্বর বাঁদিক থেকে আসছিল, দরজার পেছন থেকে কাচের প্যানেলের ওপার থেকে। আমি দরজা খুলে ভেতরে পা দিলাম, একটি অন্ধকার ছোট্ট ঘর, একা একটি জানালা, যার ভেতর দিয়ে স্ট্রিট লাইটের মলিন আলো এসে পড়েছে।
— কেউ কি এখানে রয়েছে? – প্রশ্ন করলাম।
এবার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আমি ফস করে দেশলাই জ্বালালাম। যতটুকু সময় সেই দেশলাই কাঠি জ্বলল দেখলাম রক্তাপ্লুত মেঝেতে একটি লোক বসে আছে একেবারে আমার পায়ের কাছে। আমি যদি আর এক পা এগোতাম তাহলে তাকে মাড়িয়ে ফেলতাম। তার পা দুটো সামনের দিকে ছড়ানো আর হাত দুটো মেঝেতে ভর দেওয়া। সে চেষ্টা করছে তার সুদর্শন মুখটিকে তুলে ধরার, পিচের মতো কালো দাড়ির ভেতর মৃত্যুভয়ে মাখামাখি একটি মুখ। বড়ো বড়ো চোখ তুলে সে আমার দিকে তাকিয়ে, সেই চোখে নি:শব্দ ভয়, ব্যথা ও অনুনয়ের ভাষা আমি পড়তে পারছিলাম। শীতল ঘামের বড় বড় বিন্ধু তার মুখে ফুটে উঠছে। সেই ঘাম, তার মুখের অভিব্যক্তি, তার কম্পমান হাত যা সে মেঝেতে চেপে ধরে আছে, তার কষ্টে শ্বাস ফেলার আওয়াজ, শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরা মুখশ্রী বুঝিয়ে দিচ্ছে তার যন্ত্রণা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তার ডান হাতের সামনে প্রচুর রক্তের ওপর একটি রিভলবার শুয়ে আছে।
— চলে যেও না – চাপা স্বর কানে এলো, ততক্ষণে দেশলাই কাঠি নিভে গেছে।
— ওখানে টেবিলের ওপর একটি মোমবাতি রয়েছে।
আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার ঠিক কী করা উচিত। আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আর মনে হল একে আগে কোথাও দেখেছি।
— যন্ত্রণা সহ্যের বাইরে, সে ফিসফিস করে উঠল, — আমার সেই শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই যে নিজের ওপর আবার গুলি চালাতে পারি। আমার বোধশক্তিও হারিয়ে ফেলেছি।
আমি আমার ওভারকোট খুলে ফেললাম, আহত লোকটার শুশ্রূষায় লেগে পড়লাম। শিশুর মতো লোকটাকে মেঝে থেকে পাঁজাকোলা করে তুললাম, আমেরিকান চামড়া দিয়ে আবৃত সোফার ওপর তাকে শুইয়ে দিলাম, সযত্নে তার কাপড়চোপড় খুলে ফেললাম, যখন আমি তার কাপড় খুলছি তখন ঠান্ডায় সে কাঁপছিল, যে ক্ষত আমার চোখে পড়ল, তা তার কাঁপুনি কিম্বা মুখের অভিব্যক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এটি আমার কাছে খুব বড় ক্ষত বলে মনে হল না। এটা একটা ছোটখাটো আঘাত। গুলিটি তার বাঁদিকের ৫নং ও ৬নং পাঁজর এর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে শুধু ত্বক ও মাংসকে ছিদ্র করে। আমি গুলিটি কোট লাইনিং-এর ভাঁজের পেছনের পকেটের কাছে খুঁজে পেলাম, রক্তপাত বন্ধ করার জন্যে বালিশ-ঢাকনা, তোয়ালে ও রুমাল দিয়ে একটা সাময়িক ব্যান্ডেজ বেঁধে দেবার যতখানি সম্ভব চেষ্টা করলাম। আমি তাকে খাবার জল দিলাম আর প্যাসেজে ঝোলানো ফারের কোট দিয়ে তাকে ঢেকে দেবার চেষ্টা করলাম। আমরা এইসময় দুজনেই পারস্পরিক একটি কথারও বিনিময় করলাম না। সে নি:শব্দে স্থির হয়ে শুয়ে ছিল আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল যাতে তার চোখে বেশ অস্বস্তি দেখতে পাচ্ছিলাম, মনে হল সে তার অক্ষম গুলি ছোঁড়ার কারণে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করতে হল বলে বেশ লজ্জা পেয়েছে।
— তোমাকে এখনও শুয়ে থাকতে হচ্ছে বলে নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি – আমি ব্যান্ডেজ করতে করতে বললাম — আমাকে এখন কেমিস্ট এর কাছে ছুটে যেতে হবে কিছু ওষুধ আনার জন্যে।
— দরকার নেই। সে চোখ বড়ো বড়ো করে আমার শার্টের হাতায় ধরে বলল।
আমি তার চোখের আতঙ্ক দেখতে পেলাম। আমি হয়তো চলে যাবো এটাতেই তার ভয়।
— দরকার নেই। আরও পাঁচ মিনিট থাকো…. দশ মিনিট। যদি এতে তোমার বিরক্তবোধ না হয়, থাকো। তোমাকে অনুনয় করছি।
যখন সে আমাকে আরও একটু সময় থাকার জন্যে ভিক্ষা চাইছিল তখন সে কাঁপছিল, দাঁতগুলো কাঁপুনিতে ঠকঠক করছিল। আমি তার অনুরোধ শুনলাম, সোফার এক ধারে বসলাম। দশ মিনিট নীরবতায় কেটে গেল। আমি চুপচাপ বসে ঘরের ভেতরটা লক্ষ করছিলাম যেখানে ভাগ্য আমাকে অযাচিতভাবে টেনে এনেছে। কী দারিদ্র্য! এই লোকটা, যে একটি সুন্দর দেহ, কোমল চেহারা, শৌখিন দাড়ির অধিকারী, তার ঘরের এই কী অবস্থা, একটা অতি সাধারণ কাজের লোকও বুঝি ঈর্ষান্বিত হবে না। আমেরিকান চামড়ার সোফাটি এদিক ওদিক ছেঁড়া, একটি প্রায় পরিত্যক্ত তেলচিটে চেয়ার, দেয়ালের ওলিওগ্রাফটি পুরনো, তেলচিটে। বিবর্ণ, বিষণ্ণ এক পরিবেশ।
অসুস্থ লোকটা চোখ বন্ধ করে বলছিল — কী চমৎকার হাওয়া! কী চমৎকার সে শিস দিচ্ছে!
— হ্যাঁ, আমি বললাম — আন্দাজ করছি আমি তোমাকে জানি। গতবছর তুমি কি লুহাতচেভের ভিলাতে কোনও প্রাইভেট থিয়েটারে অংশ নিয়েছিলে?
— তাতে কি? সে দ্রুত চোখ খুলে আমাকে জিজ্ঞেস করে।
একটা হালকা মেঘের ছায়া তার মুখের ওপর দিয়ে চলে গেল।
— আমি নিশ্চিত তোমাকে আমি ওখানেই দেখেছি। তোমার নাম ভাসিলিয়েভ নয়?
— যদি তা হয়েও থাকে, তাতে কি! তুমি আমাকে এখন যে অবস্থায় দেখছ, তার চাইতে নিশ্চিত ওটা বেটার কিছু নয়!
— না, আমি তোমাকে এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম।
ভাসিলিয়েভ আবার চোখ বন্ধ করে, মনে হল এরকম প্রশ্ন সে পছন্দ করেনি, মুখটা সোফার পেছনদিকে ঘুরিয়ে রাখল।
— আমি তোমার কৌতূহল ঠিক বুঝতে পারলাম না। সে বিড়বিড় করল, তুমি পরের ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারতে, জিজ্ঞেস করতে পারতে, কী আমাকে আত্মহত্যা করতে প্রণোদিত করল।

একমিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই সে আমার দিকে আবার মুখটা ফেরাল, চোখ খুলে সে কান্নাভেজা কণ্ঠে আমাকে বলল — এরকম কান্নাভেজা স্বরে কথা বলছি বলে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে তুমি স্বীকার করবে যে আমিই ঠিক। একজন অপরাধীকে যদি জিজ্ঞেস করো কীভাবে তাকে কারাগারে ঢোকানো হল, অথবা কেন সে নিজেকে নিজে খুন করতে চাইছে এটা মোটেই কোনও মহৎ প্রশ্ন নয় কিংবা এর মধ্যে কোনও ভদ্র ব্যাপারও নেই। নিজের অলস কৌতূহলকে চরিতার্থ করার জন্যে অন্যের স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলার দাম দিতে হয়।
— নিজেকে উত্তেজিত করার কোনও প্রয়োজন নেই। তোমার উদ্দেশ্য নিয়ে আমি প্রশ্ন করব তা কখনওই মনে হয়নি।
— তুমি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারতে…যা মানুষ সবসময়ই করে থাকে। যদিও এসব জিজ্ঞেস করার কোনও মানে নেই। যদি তোমাকে ওসব বলি, তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না অথবা বুঝতে পারবে না…. এ ব্যাপারে নানা ধরনের বিশিষ্ট সব শব্দাবলী প্রয়োগ করতে দেখা যায় পুলিশকে অথবা সংবাদপত্রকে। যেমন “একতরফা প্রেম” কিংবা “নৈরাশ্যের দারিদ্র্য’’ অথচ সঠিক কারণ কিন্তু জানা নেই….তারা আমার পরিচিত নয়, তোমারও পরিচিত নয়.. সংবাদপত্রের অফিসও পরিচিত নয়, যেখানে ঔদ্ধত্য সহকারে লেখা হয় – “সুইসাইডের ডাইরি”। একমাত্র ভগবানই মানুষের আত্মার কথা জানেন যখন সে নিজের জীবন নিজে কেড়ে নেয়, কিন্তু মানুষ কখনওই তা জানতে পারে না।
— সবই ঠিক। কিন্তু এখন তোমার কথা বলা উচিত নয়।
— কিন্তু আমার আত্মহত্যা আটকানো যাবে না-। সে মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর মাথা রাখল এবং এক বড়সড় বিশিষ্ট অধ্যাপকের কণ্ঠে বলতে লাগল — মানুষ কখনওই বুঝতে পারবে না আত্মহত্যার মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা! কারণটা সে ব্যাখ্যা করবে কীভাবে! আজ একটা কারণ হতে পারে যে কেউ তার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিয়েছে। আগামীকাল সেই একই কারণটাকে মনে হতে পারে একটা পচা ডিমের মতো। সব কিছুই নির্ভর করে ব্যক্তির সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির ওপর। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে করো আধঘন্টা আগে, আমার আসক্তি হয়েছিল মৃত্যুর জন্যে, এখন যখন মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে, এবং তুমি বসে আছ আমার পাশে, আমি ওই মৃত্যুইচ্ছের কথা ভাবতে চাইছি না, এই মানসিক পরিবর্তনের কথা ব্যাখ্যা করতে পারো যদি তুমি পারো। এই যে আপাত ভালো বোধ করছি, মনে হচ্ছে পাশের ঘরে নিথর আমার মৃত স্ত্রী মৃত্যু থেকে জেগে উঠেছে! এটা কি এই মোমবাতির আলোর প্রভাব না কি একজন বাইরের লোকের উপস্থিতিতে?
— আলোর নিশ্চিত একটি প্রভাব রয়েছে – কিছু বলতে হয় বলেই আমি কথাগুলো উচ্চারণ করলাম — জীবদেহের ওপর আলোর প্রভাব রয়েছে…
— আলোর প্রভাব… এটা স্বীকার করি! কিন্তু জান, মানুষ মোমবাতি দিয়ে নিজেকে গুলি করতে পারে! সত্যিই ব্যাপারটা তোমার উপন্যাসের নায়কের পক্ষে লজ্জাজনক যদি মোমবাতির মতো একটি তুচ্ছ বস্তু নাটকীয়তাকে হঠাৎ করে বদলে দিতে পারে। তারপর এইসব আজেবাজে ঘটনার হয়তো একটা বর্ণনা তৈরি করা হবে, কিন্তু আমাদের দ্বারা নয়, যে বুঝতেই পারে তার প্রশ্ন করা একেবারেই নিরর্থক।
— ক্ষমা চাইছি – আমি বললাম, তোমার মুখের ভাষা দেখে এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে… ভঙ্গি করছ মানে নাটক করছ।
— হ্যাঁ! ভাসিলিয়েভ চমকিত হয়ে বলল, এটা হতেই পারে! আমি প্রকৃতিগতভাবে আত্মগর্বী। বেশ, যদি মুখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা তোমার থেকে থাকে, তাহলে এটা ব্যাখ্যা করো।
এই কথাগুলো ভাসিলিয়েভ উচ্চারণ করলো একেবারেই ক্লান্ত অবসিত কণ্ঠে। সে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল, সে নীরবতায় ডুবে যাচ্ছিল। এই বিরতির সময়টা বেশ ভালো করে লক্ষ করা গেল। আমি তাকে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাসে তার চেহারা। মনে হচ্ছিল জীবন এতক্ষণে তার কাছে অবলুপ্ত হয়ে গেছে এবং শুধুমাত্র সবধরনের বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি নিয়ে এই আত্মম্ভরি মানুষটা যুঝছে। এইরকমের একটা মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকলে ভারি কষ্ট হয়, বড্ড ব্যথা হয়। এরপরও কোন শক্তি দিয়ে ভাসিলিয়েভ এই বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই বাহ্যিক ভঙ্গিমার ব্যাপারস্যাপার!
— তুমি এখানে! আছো এখনও? – আচমকা সে প্রশ্নটি করে কনুই এর ওপর ভর করে বলল, মাই গড! তাহলে শোনো!
বৃষ্টি পড়েই চলেছে, থামার কোনও লক্ষণ নেই, যেন সে রেগে গিয়ে অন্ধকার জানালার ওপর আছড়ে পড়ছে। আমি শুনতে শুরু করলাম।
“আমি বরফের চেয়েও সাদা হয়ে যেতে পারি, এবং আমার কান শুনতে পারে আনন্দ ও উল্লাসের শব্দ’’, মাদাম মিমোতি ফিরে এসেছিল, ড্রয়িংরুমে বসে অবসন্ন, ক্লান্ত, একই অবতলে বাঁধা স্বরে অসম্ভব ক্লান্তিকরভাবে মৃতের সামনে বাইবেল থেকে কিছু পড়ে যাচ্ছিল।
— এটা উল্লসিত করছে, তাই না?
ভাসিলিয়েভ ফিসফিস করল- তার ভয়ার্ত দৃষ্টি আমার দিকে ফিরিয়ে- হে ভগবান! এইসব একটা মানুষকে দেখতে হচ্ছে আর শুনতে হচ্ছে! যদি কেউ এইসব বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গীতে রূপান্তরিত করতে পারত! যেভাবে হ্যামলেট বলেছিল – “It would Confound the ignorant, and amaze indeed, the very faculties of eyes and ears.” কীভাবে তাহলে আমার সেই সঙ্গীতের সুর বুঝতে পারা উচিত! কীভাবে তাকে অনুভব করা উচিত! এখন ক’টা বাজে?
— তিনটে বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।
— সকাল হতে তাহলে অনেক বাকি। সকালবেলায় অন্তিম সংস্কারের কাজটা আছে। একটা মনোরম দৃশ্য! একজন কফিনকে অনুসরণ করে যাবে বৃষ্টি আর কাদার মধ্যে দিয়ে। একজন পাশে হাঁটবে কফিনের পাশে পাশে, মেঘলা আকাশ আর বিধ্বস্ত দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে যাবে, জলকাদা মাখা পথের নৈঃশব্দ, সরাইখানা, গাদা করে রাখা কাঠ, একজনের ট্রাউজার হাঁটু পর্যন্ত ভেজানো, অন্তহীন রাস্তা। সময় তাকে টেনে নিয়ে যাবে যেন সব কিছুই অন্তহীন, কর্কশ কিছু মানুষ, আর হৃদয় যেন পাথর, যেন পাথর!
একটুখানি সময় থেমে সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল — তুমি কি অনেক আগে জেনারেল লুহাতচেভকে দেখেছিলে?
— আমি গত গ্রীষ্মের পর আর তাঁকে দেখিনি।
— সে নিজেকে জাহির করতে ভালবাসে। কিন্তু সে ছোটখাটো একটি সুন্দর মানুষ। তুমি কি তোমার লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছ?
— হ্যাঁ। সেটা অল্পবিস্তর।
— হ্যাঁ… তুমি কি মনে করতে পার কীভাবে আমি থিয়েটারে উল্লাসে লাফিয়ে উঠেছিলাম ছুঁচের মতো, উৎসাহী গাধার মতো যখন জিনাকে প্রেম নিবেদন করছিলাম? ওইটা ছিল বোকা বোকা, কিন্তু ওটা ভালো ছিল, মজার ছিল…ওইসব স্মৃতি আমাকে টেনে নিয়ে যায় একঝলক বসন্তে…আর এখন! কী ক্রুর পটপরিবর্তন! এইটা তোমার জন্যে একটা বিষয় বটে! তুমি কি লিখতে যাচ্ছ না “এক আত্মহত্যার ডাইরি”। ওটা অবশ্য স্থূল আর গতানুগতিক হবে। তুমি এর ভেতর কিছু হাস্যরস মিশিয়ে একটু নতুনভাবে লিখো।
— তুমি আবার সেই… নাটকীয় ভঙ্গিতে আছ- । আমি বললাম — এই অবস্থায় হাস্যরসের কিছু থাকতে পারে না।
— হাসির মতো কিছুই নেই? ভাসিলিয়েভ উঠে বসলো, মুক্তোবিন্দুর মতো চোখের জল ঝরে পড়তে লাগলো। এক তিক্ত কষ্ট ও যন্ত্রণা তার ফ্যাকাসে মুখে ফুটে উঠল। তার চিবুক থরথর করতে লাগলো।
— তুমি কেরানিদের ও অবিশ্বাসী স্ত্রীদের প্রতারণায় হাসো– সে বলল — কিন্তু কোনও কেরানি, কোনও অবিশ্বাসী স্ত্রী আমার সাথে প্রতারণা করেনি, করেছে আমার ভাগ্য। আমি কোনও ব্যাঙ্কের গ্রাহক হিসেবে প্রতারিত হইনি, কোনও প্রতারিত স্বামীও আমার মতো কখনও প্রতারিত হয়নি। শুধু অনুভব করো যে আমাকে অদ্ভুত এবং বোকা বানানো হয়েছে। গতবছর তোমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আমি জানতাম না নিজেকে সুখী হওয়ার জন্যে আমার ঠিক কী করা দরকার। আর এখন তোমার চোখের সামনে….
ভাসিলিয়েভের মাথাটা বালিশের ভেতর ডুবে গেল আর এবার সে হাসতে লাগলো।
— এরচাইতে অদ্ভুত ও হদ্দ বোকামো আর কিছু হতেই পারে না, কারোর পক্ষেই এসব কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অধ্যায় এক – বসন্ত, ভালবাসা, হনিমুন…. প্রেম, বস্তুত; অধ্যায় দুই – চাকরি খোঁজা, বন্ধকি ব্যবসা, অনিশ্চয়তা, ভয়, কেমিস্টের দোকান… আগামীকাল কাদা থেকে কবরস্থানে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।
সে আবার হাসলো।
আমি তীব্রভাবে অস্বস্তি অনুভব করছিলাম এবং মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এখান থেকে চলে যাওয়ার।
— আমি তোমাকে বলছি- আমি বললাম- তুমি শুয়ে পড়ো, আমি কেমিস্ট এর কাছে যাচ্ছি।
সে কোনও উত্তর দিল না। আমি আমার ওভারকোটটা পরে নিলাম আর তার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমি যখন প্যাসেজ পেরিয়ে চলে আসছিলাম একঝলক চোখে পড়ল সেই কফিন আর মাদাম মিমোতির কফিনের দিকে ঝুঁকে, সেই পড়ে যাওয়ার ছবি। তাকে দেখে আমি চোখ কপালে তুলে জিনাকে ভাববার চেষ্টা করলাম, সেই সরল, সুন্দর, কালো কিম্বা বাদামী ত্বকের অধিকারিণী সেই উচ্ছল যুবতী যে লুহাতচেভের নাট্যদলে কাজ করতো। আমি কিছুতেই তাকে চিনতে পারলাম না।
“এভাবেই যৌবনের গৌরব কালের গর্ভে হারিয়ে যায়” – ভাবলাম।

যখন আমি বেরিয়ে যাচ্ছি, সেই রিভলবারটি সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুললাম না, আমি কেমিস্টের দোকানের দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু আমার এই যাওয়াটা ঠিক ছিল না। কেমিস্ট-এর ওখান থেকে যখন আমি ফিরে এলাম, দেখলাম ভাসিলিয়েভ সোফায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ব্যান্ডেজ যেমন তেমন করে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, সেই খোলা ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে। তাকে পুনরায় চেতনায় ফিরিয়ে আনতে যখন সক্ষম হলাম তখন সকাল হয়ে গেছে। সে প্রবল উত্তেজনায় প্রলাপ বকছিল, কাঁপছিল, পুরো ঘরটা সে চোখ বুলিয়ে দেখছিল। আমরা পুরোহিতের মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর গুরুগম্ভীর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।
যখন ভাসিলিয়েভের ঘর বৃদ্ধা মহিলা ও নৈ:শব্দে পূর্ণ হয়ে গেল, যখন কফিন তুলে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমি ভাসিলিয়েভকে তার ঘরে থাকতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু সে আমার কথা শুনলো না, এই বৃষ্টিস্নাত ধূসর সকালে নিজের অসম্ভব ব্যথা ও আঘাত নিয়ে সে কফিনের পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। সে খালি মাথায় নি:শব্দে হাঁটতে লাগলো কফিনের পেছন পেছন সমাধিস্থলের দিকে, হাঁটতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল, নিদারুণ কষ্ট হচ্ছিল একটা পা তুলে আরেকটা পা ফেলতে। সময়ে সময়ে সে আঁকড়ে ধরছিল ক্ষতস্থানটা ,অথচ তার চেহারা সম্পূর্ণভাবে উদাসীন, নিরাসক্ত। একবার তাকে সেই অবসাদ থেকে উঠিয়ে আনার জন্যে আমি এমনই কিছু অদরকারী প্রশ্ন করলাম, তখন তার দৃষ্টি পড়লো ফুটপাতের দিকে আর ছাইরঙা ফেন্সিং এর দিকে, এক মুহূর্তের জন্যে তার চেহারায় বিষণ্ণ ক্রোধ নজরে পড়ল।
“Weelright“ ( Wheelright) একটি সাইনবোর্ডের তাকিয়ে সে রেগে গিয়ে বিড়বিড় করে — অশিক্ষিত, মূর্খ মানুষ, শয়তান এদের নিয়ে যাবে।
আমি সমাধিস্থল থেকে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম।

সেই রাত থেকে একবছর অতিক্রান্ত, ভাসিলিয়েভের সেই জুতো পরার জন্যে এখন খুব কম সময়ই আছে, যা পায়ে দিয়ে সে কাদার সাথে পাল্লা দিয়ে স্ত্রীর কফিনের পিছু পিছু যাচ্ছিল।
এখন যখন আমি আমার এই গল্পটি শেষ করতে চলেছি, সে আমার ড্রয়িং রুমে বসে পিয়ানো বাজিয়ে মহিলাদের দেখাচ্ছে কীভাবে সস্তা আবেগে ভরা গাঁ গঞ্জ থেকে আসা তরুণীরা পিয়ানোতে সুর তোলে। মহিলারা হাসছে, সে-ও সাথে সাথে হাসছে। সে খুব উপভোগ করছে।
আমি তাকে পড়ার ঘরে আসার জন্যে ডাকলাম। এই মজার পরিবেশ থেকে উঠে আসার তার ইচ্ছে নেই, সে এমনভাবে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো যেন সে খুব ব্যস্ত, এখন তার হাতে বাড়তি সময় নেই। আমি গল্পটা তার হাতে দিয়ে তাকে পড়তে বললাম। আমার লেখক সত্তা নিয়ে তার সবসময় একটা তাচ্ছিল্যভাব আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে, যে দীর্ঘশ্বাস শ্লথ পাঠকদের থাকে, হাতলওলা চেয়ারে বসে পড়তে শুরু করল।
— উরে ব্বাস! কী ভয়াবহ! – সে স্মিত হেসে কথাগুলো বলল।
কিন্তু যতই সে এগোচ্ছে ততই মুখখানা গম্ভীর হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত, সেই বেদনার্ত দু:সহ স্মৃতির চাপে তার মুখটি ভীষণভাবে ফ্যাকাসে হয়ে উঠল, সে দাঁড়িয়ে পড়ল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পড়তে লাগল। যখন সে শেষ করল তখন ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পায়চারি করতে লাগল।
এটাকে কীভাবে শেষ করা যায়?
কীভাবে শেষ করা যায়? হুমম…
সে ঘরের ভেতরটা দেখল, আমাকে দেখল, নিজেকে দেখল….সে দেখল তার নিজের চমকদার ফ্যাশানদুরস্ত পোশাক, মহিলাদের হাসির শব্দ কানে আসছে..চেয়ারে ডুবে গিয়ে হাসতে লাগল, যেভাবে সে হাসছিল সেই রাতে।
— আমি তোমাকে সেদিন বলিনি সবকিছুই য়্যাবসার্ড? অহেতুক? হে ভগবান! আমি যে বোঝা বহন করে এসেছি এই পর্যন্ত, এবং হতে পারে এখন আমি এক আভিজাত্যের মোড়কে ঢুকে পড়েছি, শয়তান ঠিক জানে আমি কী ভয়াবহ কষ্ট ভোগ করে এসেছি- কোনও মানুষ এর চাইতে বেশি পীড়ন সহ্য করেনি, কিন্তু আমি ভাবছি, ওসবের চিহ্ন আজ কোথায়? এটা বিস্ময়কর! একজন হয়তো এটা ভাবতেই পারে যে পীড়ন একটা মানুষের ওপর ছাপ ফেলেছিল তা হয়তো দীর্ঘদিন তার সাথে জড়িয়ে থাকবে, কোনও ভাবেই তাকে মুছে ফেলা কিম্বা নির্মূল করা যাবে না। এবং এখন দেখছি একটা সস্তা জুতোর মতোই খুব সহজেই সেটা পায়ে গলিয়ে পরা যায়, তাতে আর কোনও চিহ্ন থাকে না, একটা ছেঁড়াফাটা দাগও থাকে না। যেন আমি অতীতে কোনও কষ্ট কিংবা যন্ত্রণা ভোগই করিনি শুধুই মাজুরিকা নৃত্য করেছি। পৃথিবীর সবকিছুই বড়ো বেশি ক্ষণস্থায়ী এবং এই ক্ষণস্থায়িত্বও অযৌক্তিক! পৃথিবীটা কৌতুকের এক বিশাল প্রান্তর। কৌতুক দিয়েই গল্পটার শেষ হোক, প্রিয় বন্ধু!
— পিওত্র নিকোলাইভিচ, তুমি কি শীঘ্র আসছো? – অধৈর্য মহিলারা আমার গল্পের নায়ককে ডাকছে।
‘এক মিনিট’ বলে সেই আত্মম্ভরি লোকটা, তার টাই টান টান করে বলল — এটা একেবারেই অযৌক্তিক, করুণা উদ্রেককর, প্রিয় বন্ধু, কিন্তু কী আর করা যাবে, বিজ্ঞ লেখক!… তবে আমি প্রকৃতি মাকে প্রশংসা করি, তার জন্যেই ক্রমাগত রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে প্রতিটি বস্তুর। ক্রমাগত প্রতিটি বস্তুর রূপান্তর চলছে। যদি এই রূপান্তর না হত, আমরা স্থির থাকতাম অরূপান্তরিত অবস্থায়, তাহলে দাঁতে ব্যথার মতো দু:সহ সব স্মৃতি টেনে নিয়ে বেড়াতে হত, এবং আমরা এই সাধারণ নশ্বর মানুষদের সারাজীবন দু:সহ সব স্মৃতি টেনে টেনে নিয়ে চলতে হত।
আমি তার হাসিভরা মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, সেই কষ্ট ও ভয়াবহ রাতের কথা, তার সেই চোখের যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টি, সেই একবছর আগের অন্ধকার জানালার আছড়ে পড়া রাগী বৃষ্টির দিকে তার তাকিয়ে থাকা, আমি তাকে দেখলাম, চিরাচরিত পেশাদারি বৌদ্ধিক বাচালতার ভূমিকায়, নিজেকে তৈরি করছে তার নিজস্ব অলস তত্ত্বের জগতে, বস্তুর রূপান্তরের এক দৃষ্টান্ত যেন চোখের সামনে দেখলাম।
— কীভাবে এই গল্পটি আমি শেষ করবো? – গলার সুর চড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম।
ভাসিলিয়েভ শিস দিতে দিতে টাইটাকে টান টান করতে করতে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেল। আমি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম, বিরক্ত হলাম, দু:খিত হলাম, আমি দু:খিত হয়েছি কারণ আমি সেই ভয়াবহ রাতে ঐ মানুষটার কষ্টকে নিজের মতো করে অনুভব করতে পেরেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আমি যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি….।

(মূল গল্প – “A Story Without An End’’ – Anton Chekhov * মাজুরকা নৃত্য – এক বিশেষ শৈলীর নৃত্য, এর উৎপত্তিস্থল পোলান্ডের ওয়ারশের কাছে অবস্থিত মাজোভিয়ায়। প্রথমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে জনপ্রিয় নৃত্য ছিল, পরে সমাজের উচ্চ মহলের দ্বারা সমাদৃত।)