
মাছভাত (ছোটোগল্প)
কাকলী ভট্টাচার্য
নিজেদের অফিসের নীচে ঝুপড়ি দোকানটা থেকে মাছভাত খেয়ে বেরোতে গিয়েই আটকে গেল পূর্ণা, বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে, আজ সে ছাতাও আনেনি। এখন দাঁড়িয়ে থাকতে হবে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায়, যাতে অন্তত ছুটে ঢুকে যেতে পারে অফিসে।
পূর্ণার মা যখন টিফিন বানিয়ে দেয় না অথবা নিজেরও টাইম হয় না কিছু বানানোর তখন এইখানে আসতে হয়। ভালোই বানায় প্রদীপকাকু ও পুতুলকাকিমা। দোকানটা রাস্তার ধারে ঝুপড়ি হলেও অন্যান্য দোকানের তুলনায় অনেকটা পরিষ্কার। এখানে চা থেকে পায়েস — কাকু-কাকিমা সবই বানায়, অফিসের ক্যান্টিনের দামের তুলনায় কম অথচ সুস্বাদু। অফিস এরিয়ার রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা এই সমস্ত ঝুপড়ি দোকানগুলোর রোজগার পুরোটাই অফিসে আসা লোকেদের ওপর নির্ভরশীল, সবাই তাদের নিজস্বতা দেখিয়ে কাস্টমারদের আকর্ষণ করতে চায়।
এক গোছা টাকার বান্ডিল গুনতে গুনতে পান-গোঁজা মুখে প্রদীপকাকু বলল — মামনি আমার চেয়ারটায় বসো। বৃষ্টি কমলে যাবেখন।
পূর্ণা হালকা হেসে বলে — না কাকু ঠিক আছে, বৃষ্টিটা একটু থামলেই বেরিয়ে যাব।
আসলে এটা লাঞ্চের পিক টাইম, তার ওপর বৃষ্টি, দোকানটায় ভালোই ভিড় জমেছে, সেখানে বসার জন্য চেয়ারের ঘাটতি পড়ছে, সেই সময় বাড়তি একটা চেয়ারে বসে অ্যাডভান্টেজ নেওয়াটা যথাযথ মনে করেনি পূর্ণা।
ভিড়ের ক্যাঁচোর ম্যাচোর আওয়াজ হচ্ছে, আর পূর্ণা বাইরে বৃষ্টির দৃশ্য উপভোগ করছে, এই সময় কানে এল এক ছেলের গলা, সে প্রদীপকাকুকে মাছভাত সবজিভাত এসবের দাম জিজ্ঞেস করছে।
প্রদীপকাকু বলছে — মাংসভাত ৮৫টাকা, মাছভাত ৭০ টাকা ও সবজিভাত ৫৫ টাকা।
ছেলেটি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে, মাছ ভাতে কি সবজি থাকে?
প্রদীপ কাকু বলল — সব ভাতেই সবজি, ডাল থাকে, সাথে শুধু মাছ মাংস যোগ হয় আর টাকাও বাড়তে থাকে।
ছেলেটি এবার বলল, আচ্ছা যদি শুধু মাছভাত নিই?
প্রদীপকাকু থমকে গিয়ে ভেবে বলল, ৪০ টাকা।
পূর্ণা এটা শুনে ঘুরে তাকাল ছেলেটাকে দেখার জন্য, আসলে এখানে কেউ এইভাবে খাবারের দাম করে না। যারা বাইরের খাবার অর্ডার করে তাদের কাছে এইসব মূল্য তুচ্ছ, তাই আগন্তুক দেখার জন্য উৎসাহ জাগল। বাচ্চা বয়স, হয়তো এবছরই পাসআউট, বেশ পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে রাখা, মনে হয় ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। প্রদীপকাকুর মুখে দাম শুনে এখন পার্স হাতড়াচ্ছে।
মুখটা ম্লান করে জিজ্ঞাসা করে — আর শুধু ডালভাত?
প্রদীপকাকু খানিকটা অবাক হয়েই যেন বলল — ২০ টাকা।
ছেলেটি ম্লানমুখে বলল — আচ্ছা তাইই দাও।
এটা বলেই ছেলেটি আপনমনে কিছু বিড়বিড় করতে থাকে, এমন সময় তার একটি ফোন আসে।
সে ফোন ধরে বলে — হ্যাঁ মা, বলো। না না আমি মাছভাত খেয়ে নিয়েছি। না মা তুমি চিন্তা করো না আমি জানি মাছভাত খেতে হয় যেকোনো পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ দেওয়ার আগে। তুমি চিন্তা করো না, ইন্টারভিউ ভালোই হবে, এখন রাখছি।
পূর্ণা বুঝতে পারে ওই মাছভাতটুকু ছেলেটির সামর্থ্যের বাইরে। হয়তো জন্মগত গরীব বা নিম্নবিত্ত অথবা ভাগ্যের পরিহাসে এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
পূর্ণার মনে পড়ে, আজ থেকে ৪ বছর আগে তার অবস্থাও এরকম ছিল, বাবা সামান্য প্রাইমারি স্কুলের টিচার, ওর এক ছোটোভাইও ছিল। ওদের ৪ জনের সংসারে অঢেল জিনিস না থাকলেও অঢেল ছিল খুশি। মা-বাবা ওদের দুজনকেই সমানভাবে মানুষ করেছিল, ও যখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভালো র্যাঙ্ক করে তখন সবাই খুব খুশি হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল প্রথম থেকেই ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়বে। গভর্মেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সে ভর্তি হয়। সামর্থ্যের মধ্যে না হলেও তার বাবা অনেক কষ্ট করে তার পড়াশোনা চালাতে থাকে। তৃতীয়বর্ষ থেকেই সে চাকরির তোড়জোড় শুরু করে। বাড়ির সবার তার ওপর খুব আশা ছিল। কিন্তু একদিন কলেজ যাওয়ার পথে তার অ্যাক্সিডেন্ট হয়, ভেঙে যায় তার একটি হাত ও একটি পা আর তাতেই নষ্ট হয়ে যায় তার তৃতীয়বর্ষের ৮টি মাস। ফলে তার পড়াশোনার গ্রাফে ১টি বছর ড্রপ আউটের দাগ লেগে যায়।
বাবার কিঞ্চিৎ জমানো টাকা জলের মতো খরচ হয়ে যায়, বাবা যেন হঠাৎ করে বুড়ো হয়ে যায়। চতুর্থবর্ষে যখন ইন্টারভিউ শুরু হয়, বাকি বিভাগে ১০/১২টা করে কোম্পানি আসছিল, কিন্তু তার বিভাগে মাত্র ৪টা কোম্পানি ক্যাম্পাসিংয়ে আসে। প্রথম তিনটে কোম্পানি তার এক বছরের গ্যাপের জন্য রিজেক্ট করে দেয়। শেষে চতুর্থ কোম্পানিতে চান্স পায়।
বাড়িতে খুশির আলো জাগলেও এই কোম্পানি ডিগ্রি কমপ্লিটের পরেও যখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠায় না তখন পূর্ণা আবার চাকরি খোঁজা শুরু করে। সঙ্গে কিছু টিউশন জোগাড় করে নেয় সে। এইসময় তার বাবার সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। এক লহমায় যেন তাদের সংসারটা শেষ হয়ে যায়। বাবার জমানো টাকাও নেই। টিউশনির সামান্য কয়টা টাকায় বাবার চিকিৎসা, ভাইয়ের পড়াশোনা, সংসারের যাবতীয় খরচ, কোনোটাই ঠিক মত চলছিল না। শেষে মায়ের কিছু গয়নাও বিক্রি করতে হয়েছিল। পূর্ণা তখন মরিয়া হয়ে যেকোনো একটা চাকরি খুঁজছিল। শেষে একটা প্রাইভেট কলেজে পার্ট টাইম প্রফেসর হয়ে ঢোকে। এতেই কয়েকমাস টেনেটুনে ডালভাত খেয়ে তাদের সংসার চলছিল। ঠিক তখনই কোম্পানি থেকে অফার লেটারটি আসে। বানের জলে ভাসতে ভাসতে তারা যেন একখণ্ড দ্বীপ খুঁজে পেয়েছিল সাহারা হিসেবে। এই তিনবছরে তাদের সংসার আবার আগের মতো স্বচ্ছল, বাবাও সুস্থ হয়ে এখন আবার স্কুলে যাতায়াত করছে, ভাইও পড়াশোনা শেষ করে ভিন রাজ্যে যাবে চাকরি করতে। সে জানে ওই কটা দিনের সময়, ডালভাতের দামও তাদের কাছে অনেক ছিল। তাই এখনের মাছভাতের মর্মও তাদের কাছে অনেক। তাদেরকেও কোনো বড় পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ের সময় তাদের মা যেখান থেকে পারত একটু মাছভাত এনে তাদের মুখে তুলে দিত, সেদিনটা হয়তো তাদের মা আধপেটা খেয়েই থাকত।
— এক প্লেট ডাভাত এদিকে দাও দিকিনি পুতুল।
প্রদীপকাকুর গলার আওয়াজে পূর্ণা তার অতীতের চিন্তাগুলো থেকে বর্তমানে ফিরে আসে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, সে প্রদীপকাকুকে তার খাবারের দাম ১৫০ টাকা দিয়ে বলে — এই নাও কাকু আমার টাকাটা।
প্রদীপকাকু টাকাটা নিয়ে বলে, আরে মামণি! তোমার তো ৭০ টাকা এত টাকা দিচ্ছ কেন?
পূর্ণা হেসে ওই বাচ্চা ছেলেটিকে ইশারায় দেখিয়ে বলে, কাকু তুমি দুটো মাছভাতের দাম রেখে দাও।
এক অচেনা ছেলের জন্য পূর্ণাকে মাছভাতের দাম দিতে দেখে প্রদীপকাকু লজ্জিত হয়ে বলল — কি যে বলো মামণি! তুমি কি একাই তাকে ইন্তারভি না কি যেন বলো তোমরা, তার আগে মাছভাত খাওয়াতে চাও?
এটা বলে তিনি তার স্ত্রীর দিকে ইশারায় তাকাতে বলে। পূর্ণা অবাক হয়ে দেখে পুতুলকাকিমা সবজিভাতের প্লেটটা ছেলেটির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর তাতে জ্বলজ্বল করছে একটি বড়ো মাছের পিস।
— ব্যবসা চালাই বলে কি আমাদের মনুষ্যত্ব নেই নাকি মামণি!
পূর্ণা আনন্দাশ্রু চোখে বলে — না না কাকু আমি তা বলতে চাইনি…..
প্রদীপকাকু ততক্ষণে তার হাতে ৮০ টাকা গুঁজে দিয়ে নিজের কাজে মন দিয়েছেন।
পূর্ণাও খুশি মনে ধীরে ধীরে অফিসের দিকে পা বাড়ায়।
সত্যিই মানুষের মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে।