
নক্সাপাড় আর গন্ধতেল (ছোটোগল্প)
গোপা চট্টোপাধ্যায়
বাড়িটাতে ঢুকে ধুলোমাখা তালাটায় চাবিটা দিয়ে ঘোরাতেই খটাং করে তালাটা খুলে গেল। নীলু ওরফে নীলাদ্রি প্রায় সাড়ে ছবছর পর এসেছে বন্ধ পৈতৃক বাড়িটায়। অটোস্টপ থেকে নেমে গলির ভেতর সর্পিলাকার প্রায় সাত মিনিটের হাঁটাপথের শেষে নীল রঙ-এর তেতলা বাড়িটা, পলেস্তারা খসে পড়েছে। এক কালের গমগম করা বাড়িটা এখন তালাবন্দি হয়ে হাহাকার করে। তালাটা খোলার পর ক্যাচ করে কর্কশ শব্দ করে দরজাটা খুলল নীলু। একঝাঁক ধুলো এসে নাকে লাগল তার। পকেট থেকে রুমাল নিয়ে নাকে চাপা দিয়ে নীলু দু-এক পা করে এগোল।
নীলুর বাবারা তিন ভাই, দু বোন। তেতলা বাড়ির প্রতিটি তলায় একেক ভাই থাকতেন এককালে। একতলায় নীলুদের সাথেই থাকতেন ঠাকুমা, দাদামশাই। ঢুকেই বাঁদিকে ঠাকুমার ঘর লাগোয়া ঠাকুরঘর। ঠাকুমার ঘরের কালো কাঠের হাতির শুঁড় ডিজাইন করা খাটের ওপর একটা ছেঁড়া তোষক পাতা। নীলু এক-দু পা করে এগিয়ে গিয়ে তোষকটা একটু ঝাড়া দিয়ে তুলল। ও জানে ঠাকুমার তোষকের নিচে জমা থাকত গুচ্ছের পলিথিন প্যাকেট, খবরের কাগজ। ধুলো পড়া কালো কাঠের তক্তার ওপর পেল একটা পুরনো চিঠি।
লেখাটা নীলুর চেনা। গোল গোল অক্ষরে লেখা ছোটপিসির চিঠি।
শ্রীচরণেষু মা…
নীলু মোবাইলে ছবি তুলবে বলে চিঠিটা পকেটে পুরল। পিসিকে পাঠাবে হোয়াটসঅ্যাপে। নীলু বছর দশেক আগে এই বাড়ি ছেড়েছিল। এরপরের বছরগুলো কেটে গেছে অসম্ভব দ্রুততায়। দুবছরের ব্যবধানে ঠাকুমা-দাদামশায়ের মৃত্যু হল। নীলুরা সব তুতো ভাইবোনেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দেশ বিদেশে। যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করত একমাত্র নীলুই। ঠাকুমার ঘরটা থেকে বেরিয়ে এক-দুপা করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল নীলু। লাল সিঁড়ির রং মলিন হয়ে আবছা হয়ে আছে। মাঝে মাঝে এক দুখানা ঠাম্মার বা জ্যেঠিমার আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আভাস আছে। হঠাৎ ঘুলঘুলি দিয়ে একদমকা বাতাসের সাথে ধুলো আর বহু পরিচিত কামিনী ফুলের গন্ধ পেল নীলু। দালান বাড়ির পেছনেই ছিল টিনের দোচালা সিমেন্টের গাঁথনির দোচালা ঘর। ছায়াপিসি আর ওর মেয়ে মনিকা থাকত। শুনেছিল ছায়াপিসি ওদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বাংলাদেশ থেকে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে এসেছিল। দেড় বছরের মনিকাকে রেখে স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। মনিকা ছিল ওদেরই সমবয়সী। ওদের সাথেই স্কুলে যেত। কিন্ত স্কুল থেকে ফিরে ছায়াপিসিকে হাতে হাতে কাজ করে দিত। বড় জ্যেঠিমা ঠারেঠোরে ওকে আস্কারা দিলেও ঠাম্মা ওকে তিষ্ঠোতে দিতেন না। বিকেলবেলায় পাকা এক ঘন্টা ওকে দিয়ে জবাকুসুম তেল মালিশ করিয়ে চুল বাঁধাতেন ঠাম্মা। বড় জ্যেঠিমা লুকিয়ে তাকে চুলের ফিতে, পাউডার কিনে দিয়ে বেশ কয়েকবার ধরাও পড়েছিলেন। নীলু ছিল মনিকার থেকে বছর দুইয়ের বড়। মাঝে মাঝে তার কাছে পড়া বুঝতে আসলে নীলু বেশ যত্ন নিয়েই বোঝাত। সবাই এবাড়ির পাট চোকানোর পরও ছায়াপিসি মনিকাকে নিয়ে বছরখানেক ছিলেন। এরপর ওদের খবর আর কেউ পায়নি। ছায়াপিসির ঘরটা ঝড়ে ধসে গেছে। নীলু দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখল পাশের কামিনী গাছটার ফুল ভাঙা দেয়ালের ওপর পড়ে বেশ ম ম গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নীলু বুক ভরে শ্বাস নিল অনেকদিন পর। কামিনী ফুলের গন্ধের সাথে সাথে লক্ষ্মীপুজোর রাতে জেঠিমার তৈরি ঘিয়ে ভাজা লুচির গন্ধ পেল যেন নীলু। সিঁড়িটা ছাদের পাশ দিয়ে যেখানে বেঁকে আছে সেখানে একটা ছোট্ট চিলেকোঠা মতো ছিল। সেখানে পুরনো বাসন-কোসন, পরিত্যক্ত আসবাব রাখা থাকত। নীলু সন্তর্পণে চিলেকোঠার দরজা খুলে দেখে মরচে পড়া লোহার কড়াই, দাদামশায়ের হাতলভাঙা চেয়ার আর একটা লুডোর বোর্ড, ধুলোমাখা হয়ে পড়ে আছে। পাশে একখানা ছোট পুতুলের বাক্স। বড়দি, মেজদি আর মনিকা মিলে পুতুলের বিয়ে সাজাত। বিয়ের খাওয়ায় থাকত চানাচুর আর বাতাসা। কখনো কখনো মনিকা জিবেগজা ভেজে কাগজের প্লেটে সাজিয়ে দিত। নীলু হাঁটু গেড়ে বসে পুতুলের বাক্সটা নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল। মাটির পুতুল আর কাপড়ের পুতুলগুলো ধুলোমাখা হয়ে আছে। কাপড়গুলো বেশ পরিচিত, মায়ের শাড়ির আঁচলের টুকরো, দিদির ওড়নার টুকরো।
চিলেকোঠার ওপর কামিনী গাছের ডালটা গড়াগড়ি খাচ্ছে। নীলু জানালার কাছে এসে আবার ছায়াপিসির ঘরটার দিকে তাকাল।
সেদিন ছিল পঞ্চমীর বিকেল। পাড়ার মণ্ডপে সবে মুর্তি এসেছে। নীলুরা সব ভাইবোন মিলে দল বেঁধে যাবে মণ্ডপে। দাদামশায়কে পাটভাঙা ধুতি বার করে দিয়েছেন ঠাম্মা। নিজের একখানা ভেলভেট পাড়ের টাংগাইল বার করেই সে কি চিৎকার।
— বড়বৌমা, আমার নক্সাপাড়ের শাড়ির পাড় ছেঁড়া কেন?
জ্যেঠিমা কাঁচুমাচু মুখে এসে দাঁড়িয়ে থাকলেও উত্তর জানা ছিল না। ঠাম্মা পানের ডিবে নিয়ে বসে জোর তলব লাগিয়েছিলেন মনিকাকে।
— মনিকাই তো আমার শাড়ি কলপ দিয়ে পাট করে রাখে।
মনিকার দশমবর্ষীয় চোখে তখন মণ্ডপে যাওয়ার তাড়া।
কিন্ত সে বছর শাস্তিস্বরূপ আর পুজো দেখার অনুমতি মেলেনি মনিকার।
নীলু পুতুলের বাক্সের নিচের তাকে নক্সাপাড়টাকে আবার ঢেকে রাখল সযত্নে।
দশমীর পরদিন সকালে প্লেটে করে নিমকি-নাড়ু সাজিয়ে এনে মনিকা তাকে কানে কানে বলেছিল,
— নীলুদাদা, তুমি আমায় পড়া দেখাও। তোমাকে মিথ্যে বলব না, বুড়ির শাড়ির নক্সাপাড় আমিই ছিঁড়েছি। তুমিই বলো, বড় জ্যেঠিমা আমাকে পুজোয় গন্ধ তেলের যে শিশিটা দিল, সেটাই বা বুড়ি কেন লুকোবে?
নীলু নারকেল নাড়ু চিবোতে চিবোতে বলেছিল, ওপাড়ার ঠাকুর এখনো বিসর্জন হয়নি। দেখবি তো চল।
— না গো দাদা। ঠাম্মা আবার ঝামেলা করবে।
সেবছর ভাইফোঁটার দিন লুকিয়ে নীলুর কপালে চন্দনের ফোঁটা পড়িয়ে জিবেগজা দিয়ে গেছিল মনিকা।
চিলেকোঠার জানালা দিয়ে ঝুলে পড়া কামিনী ফুলের ডালটাকে সরিয়ে চুপিসারে নক্সাপাড়ের পুতুলের কাপড়টা পকেটে ঢোকাল নীলু। আরেকটা পকেটে ঠাম্মার ঘর থেকে নেয়া গন্ধ তেলের শিশি।
পায়ে পায়ে বাড়ির ছাদে উঠে এসেছে নীলু।
ছাদের ওপর একটা টিনের বাক্সে ঠাম্মার কিছু পরিত্যক্ত শাড়ি, জবাকুসুম তেলের শিশি আর পানের ডিবি গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মোবাইলে ফোন এল স্ত্রী রমিতার।
— কোথায় তুমি? পোড়োবাড়িতে গিয়ে ভূতে ধরলো নাকি!
নীলু হাসল, ভূত মানেই তো অতীত রমি।
— সবার এমন কিছু অতীত থাকে যা বহু বছর পরও কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে লুকিয়ে রাখতে হয়।
পলেস্তারা খসে যাওয়া দেয়ালটার কাছে গিয়ে নীলুর মনে হল অনাথা কোন বালিকার বিশ্বাসটুকুকে পকেটে লুকিয়ে নিয়ে যেতেই বোধহয় সে এ বাড়িতে এসেছিল। তার সাথে লুকিয়ে নিল তার জাঁদরেল সুন্দরী ঠাম্মার লুকিয়ে রাখা গন্ধ তেলের শিশিটিও।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ঠাম্মার পানের ডিবের ঝাঁঝালো গন্ধটাও নাকে এল যেন। অতীত আর ভূত একসাথে জাঁকিয়ে ধরল নীলুকে।