শিল্প – চেখভ

শিল্প – চেখভ

শিল্প           (ছোটোগল্প)

চেখভ

(রাশিয়ান গল্প, ইংরেজি থেকে অনুবাদঃ বিজয়া দেব)

শীতের এক বিমর্ষ সকাল।
ব্রিস্ত্রিয়াঙ্কা নদীর মসৃণ ও ঝিকমিকে উপরিভাগে এখানে ওখানে ছড়ানো বরফ চিকমিক করছিল, তার পাশে দাঁড়িয়ে দু’জন কৃষক, বেঁটেখাটো সের‍্যিওঝকা এবং চার্চের শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকা, মাটভে। সের‍্যিওঝকা, পা দুটো ছোট, জীর্ণ, সে বছর তিরিশের হবে, বেশবাস নোংরা মতোন, রাগী চোখে বরফের দিকে তাকিয়েছিল। ভেড়ার লোমের পোশাক থেকে উলের গোল্লা নেমে আসা তার অবয়বটি নোংরা কুকুরের মতো দেখাচ্ছিল। তার হাতে দুই দিকে ধারালো স্টিকের কম্পাস। মাটভে, দেখতে পরিচ্ছন্ন এক বৃদ্ধ মানুষ পরনে ঝকঝকে ভেড়ার লোমের পোশাক, হাঁটু পর্যন্ত তোলা বুট, শান্ত নীল চোখে উপরের দিকে তাকিয়েছিল যেখানে ঢালু নদীর তীরে একটি গ্রামের ছবির মতো ছোট ছোট বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছিল। তাঁর হাতে একটি ভারী শাবল।
— আচ্ছা আমাদের এভাবে হাত গুটিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে? নীরবতা ভঙ্গ করে রাগী চোখ মাটভের চোখে রেখে সের‍্যিওঝকা বলল, বোকা বুড়ো, তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে এসেছ না কি কাজ করতে এসেছ?
— বেশ তুমি.. দেখিয়ে দাও… – মাটভে চোখ পিটপিট করতে করতে শান্তস্বরে বলল।
— দেখিয়ে দেবো… সবসময়ই আমাকেই দেখিয়ে দিতে হবে তোমাকে, আর করতে হবে আমাকে। তোমার নিজেদের কোনও ধারণা নেই এই ব্যাপারে! এই কম্পাস দিয়ে চিহ্নিত করো, যেটা এখন দরকার। চিহ্নিত না করলে তুমি এই বরফ ভাঙতে পারবে না। আগে চিহ্নিত করো। কম্পাসটা নাও।
মাটভে কম্পাস নিল সের‍্যিওঝকার হাত থেকে, এবং সজোরে এলোমেলোভাবে কনুই ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে শাবল চালাতে লাগল সব দিকেই, সে অস্বস্তিকরভাবে চেষ্টা করতে লাগল বরফের ওপর একটা বৃত্তকে চিহ্নিত করতে। সের‍্যিওঝকা চোখ ছোট করে আড়চোখে এবং অবজ্ঞা নিয়ে মাটভের কাজ দেখে যাচ্ছিল এবং নিশ্চিতভাবেই মাটভের অদক্ষ কাজ উপভোগ করছিল।
— এহ হে হে! – সে রাগান্বিত হয়ে বিড়বিড় করে উঠল। এই সামান্য কাজটুকুও তোমাকে দিয়ে হয় না! সত্যি কথাটি কি বলোতো! তুমি এক অপদার্থ কৃষক, মাথাটি কি কাঠ দিয়ে তৈরি? তোমার উচিত শুধু হাঁসদের চরে বেড়ানো দেখা, জর্ডন তৈরি করার জন্যে তুমি নও। কম্পাস আমাকে দাও, এদিকে দাও বলছি কম্পাসটা!
বলে কম্পাসটা সে ঘর্মাক্ত মাটভের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। এবং সাথে সাথেই পায়ের গোড়ালি ঘুরিয়ে বরফের ওপর একটা বৃত্ত তৈরি করল, তারপর জর্ডনের একটি রূপরেখা তৈরি করল, বরফ কাটার কাজ পড়েই রইল।
কিন্তু কাজ শুরু করার আগে সের‍্যিওঝকা অনেকটা সময় এমনভাবে নষ্ট করল, তার শরীরী ভাষা বলছে যে সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা লোক যাকে ছাড়া কোনও কাজই হয় না, বাকিরা সব ‘গুড ফর নাথিং’।
— আমি তোমার কাজ করে দেবার জন্যে বাধ্য নই! তুমি চার্চের কাজে আছ, তুমিই করো।

সে নিশ্চিতভাবেই এই অদ্ভুত পরিস্থিতি উপভোগ করছিল, ভাগ্যই তাকে বছরে একবার তার হাতের শৈল্পিক কাজ ও এই বিরল প্রতিভা দেখিয়ে চার্চের সবাইকে বিস্মিত করে দেওয়ার মতো সুযোগ দিয়েছে। বেচারা শান্ত স্বভাবের মাটভেকে শুনতে হচ্ছে নানারকম বিষাক্ত ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য। সের‍্যিওঝকা বিরক্তি ও রাগ নিয়ে কাজ করতে শুরু করল। সে ঢিলেমির সাথে কাজ করছে। সে বৃত্তটির ব্যাপারে বিশেষ কিছুই না বুঝিয়ে উশখুশ করতে লাগল গ্রামে গিয়ে চা খেতে, আড্ডা দিতে, বকবক করতে।
— আমি তাড়াতাড়িই ফিরে আসছি – সে সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, ইতিমধ্যে তুমি বসার জন্যে কিছু একটা আনো আর জায়গাটা পরিষ্কার করো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাক গোনার চাইতে এটা করলে ভালো হয়।

মাটভেকে একা ফেলে সে চলে গেল। হাওয়া কিছুটা ধূসর ও কর্কশ এবং স্তব্ধ ছিল। নদীর তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কুটিরগুলোর পেছনে সাদা চার্চ দাঁড়িয়ে আছে ধূসরতা ও তাঁর শালীনতা নিয়ে। কিছু পাতিকাক ক্রমাগত সোনালি বৃত্তকে ঘিরে উড়ছে, গ্রামের একটি প্রান্তে যেখানে নদীর তীরের সমতল শেষ হয়ে খাড়াই উঠে গেছে সেখানে একটি বেঁধে রাখা ঘোড়া পাথরের মতো দাঁড়িয়ে, সম্ভবত ঘুমিয়ে আছে, অথবা গভীর চিন্তায় মগ্ন।
মাটভেও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। এই বিষাদ – স্বপ্নিল নদী, পাতিকাকের গোল গোল ওড়াওড়ি, এবং ঐ প্রায় ঘুমন্ত ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারও ঘুম ঘুম লাগছিল। একঘন্টা চলে গেল, মুহূর্তের পর মুহূর্ত চলে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও সের‍্যিওঝকা এলো না। নদীর জল অনেকটাই বয়ে গেল, এবং বসার জন্যে একটি বাক্সও আনা হয়েছে, কিন্তু মাতাল লোকটাকে দেখা গেল না। মাটভে অপেক্ষা করছে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। একঘেয়েমির অনুভূতি তারই আসে যে কিছুই জানে না। যদি তাকে বলা হতো তাকে নদীর পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকো, কিংবা একমাসের জন্যে, অথবা এক বছরের জন্যে, সে হয়তো দাঁড়িয়েই থাকতো। শেষ পর্যন্ত সের‍্যিওঝকাকে অদূরের কুটিরগুলির পেছন থেকে আসতে দেখা গেল। সে এলোমেলো পায়ে হাঁটছে, পা প্রায় নড়ছেই না, লম্বা পথ হাঁটার জন্যে সেই পথচলাকে ঠিক পথচলা বলা যায় না এবং সে রাস্তা দিয়ে আসছে না, সোজাসুজি এক শর্ট কাট পথ বেছে নিয়েছে, সে আসছে হাতে লাঠি নিয়ে, বরফ, ঝোপ, উঁচুনীচু পথের ওপর দিয়ে – খুব ধীরে, থেমে থেমে।
— কি ব্যাপার বলোতো! – মাটভের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সে বলল, তুমি এখানে কিছু না করেই দাঁড়িয়ে আছো কেন? কখন তুমি বরফ ভাঙবে?

মাটভে দু’হাতে শাবল ধরল, এবং বরফ ভাঙতে শুরু করল, সেই বৃত্তকে স্থির লক্ষে রেখে, যা এঁকে রাখা হয়েছে। সের‍্যিওঝকা বাক্সের ওপর বসে তার সহকারীর এই অসম্ভব এলোমেলো কাজকে দেখতে লাগল।
— ধারগুলোতে শাবল লাগাও! তাহলে সহজ হবে! – সে নির্দেশ দিল, যদি তুমি কাজটা ঠিকঠাক করতে না পারো, তাহলে তোমার এই কাজ নেওয়াই উচিত হয়নি। একবার যদি তুমি কাজটা নিয়েছ, তাহলে তোমাকেই এই কাজটা শেষ করতে হবে। 
নদীতীরের সবচাইতে উঁচুতে ভিড় জমে গেছে। এদের দেখে সের‍্যিওঝকা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলো।
— আমি বলছি আমি এই কাজে যাচ্ছি না..- সে বলে উঠল। একটা কড়া সিগারেটের অস্বস্তিকর গন্ধ ছড়িয়ে মাটিতে কিছু থুতু ছিটিয়ে সে তাতে অগ্নিসংযোগ করলো, আমার দেখা উচিত এই কাজটা আমাকে ছাড়া কীভাবে হয়। গতবছর কস্ট্যিয়ুকভ, স্তুপকা গুলকভ কাজটা নিয়েছিল জর্ডন তৈরি করার জন্যে যেমনভাবে আমি তৈরি করি। কিন্তু তাতে কি হলো, একটা হাস্যকর ব্যাপার হলো। কস্ত্যুকভ ও তার লোকেরা আমাদের কাছেই এলো – সঙ্গে লোকে লোকারণ্য! সব গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসতে লাগলো। কারণ আমাদের ছাড়া ঠিকঠাক জর্ডন কেউ তৈরি করতে পারবে না…কাজ করো, কথা বলার সময় নেই…হ্যাঁ বুড়ো,… এই পুরো প্রদেশে তুমি আরেকটা এইরকম আরেকটা জর্ডন খুঁজে পাবে না। সৈন্যরা বলে তোমাকে দেখলেই মনে হয় তুমি একটা বেকার লোক, তারা কিন্তু ততটা ভালো নয়, এমনকি শহরেও! আস্তে! আস্তে!

মাটভে হাঁফাচ্ছে, কোঁকাচ্ছে। কাজটা তেমন সহজ নয়। বরফ খাড়া ও পুরু, তাকে এটা ভাঙতে হবে, মাঝেমধ্যে বরফের টুকরো ছিটকে পড়ছে খোলা জায়গায়, যা দিয়ে খোলা জায়গাকে বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এই কাজ যতটাই কঠিন ততটাই অনুভূতিহীন সের‍্যিওঝকার কঠিন নির্দেশ, প্রায় তিনটের মধ্যে একটা বড় বৃত্ত তৈরি হলো মাঝখানে বিস্ত্রিয়াঙ্কা নদীর কালো জল।
— গত বছর এইটার থেকে অনেক ভালো হয়েছিল – সের‍্যিওঝকা রেগে বলল, এইটুকুও তুমি সময়মতো করতে পারলে না। ঈস, একেবারেই অপদার্থ! এইসব বোকা মানুষকে ঈশ্বরের মন্দিরে রাখা হয়! যাও, এখন যাও বোর্ড নিয়ে আসো, খুঁটি তৈরি করতে হবে। ওহে কাক, সঙ্গে রিং নিয়ে এসো! আর..আর… কোথাও থেকে কিছু রুটি নিয়ে এসো তো …সঙ্গে কিছু শসা অথবা আর কিছু।
মাটভে দ্রুত চলে গেল, এবং শীগ্রই ফিরে এলো, কাঁধে এক বিশাল ভারী কাঠের রিং যা গত বছর অনেকধরনের রঙ দিয়ে নানা নকশা তৈরি করা হয়েছিল। এই রিং এর ঠিক মাঝখানে একটি লাল ক্রশ, যার পরিধিতে খুঁটি লাগানোর জন্যে ছিদ্র করা রয়েছে।
— হ্যাঁ এটা ঠিক হয়েছে, এটাকে আমরা রঙ করে নতুন করে তুলব মনে হবে একেবারেই নতুন…এসো, ওখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখন ভাষণ দেবার ডেস্কটা তৈরি করে নাও। অথবা…অথবা… ক্রশ তৈরি করার জন্যে কুঁদা নিয়ে এসো।

মাটভে, যে সারাদিন কোনও খাবারের স্বাদ পায়নি অথবা জল পানও করেনি, অনেক কষ্টে পাহাড়ি পথের ওপর দিয়ে উঠতে লাগল, সের‍্যিওঝকা যেমন করে এসেছিল তেমনই, সে খুঁটিগুলো নিজের হাতেই তৈরি করল। সে জানে এই খুঁটিগুলির অবিশ্বাস্য রকমের শক্তি আছে, যে এই খুঁটিগুলো পবিত্র জলের ওপর ধরে রাখবে তার সারাবছর ভালো কাটবে পবিত্র জলের আশির্বাদে। এই ধরনের কাজ প্রকৃতপক্ষেই করাটা মূল্যবান।

কিন্তু আসল কাজটা শুরু হলো পরেরদিন। তখন সের‍্যিওঝকা বোকা মাটভেকে পেছনে ফেলে নিজের সমস্ত মেধা দিয়ে নিজের কাজ দেখাতে শুরু করল। তার বকবকানি, দোষ খুঁজে বের করা, খেয়ালখুশি মন্তব্য ইত্যাদি আর শেষ হচ্ছে না। যখন ক্রশ তৈরি করার জন্যে মাটভে পেরেক দিয়ে দুটো কাঠের টুকরো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে, সে অসন্তুষ্ট হয়ে সেটি তাকে আবার করার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছে। যদি মাটভে দাঁড়িয়ে আছে, সের‍্যিওঝকা রাগ করে বলছে, কেন সে যাচ্ছে না। যদি সে যেতে চাইছে, সের‍্যিওঝকা চিৎকার করে তাকে চলে না গিয়ে কাজ করতে বলছে। সে ভয়ানক অসন্তুষ্ট, কাজ করার যন্ত্রপাতি নিয়ে, এই আবহাওয়া নিয়ে অথবা নিজের মেধা নিয়ে, কোনও কিছুই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না।

মাটভে করাত দিয়ে একটি বড় বরফের টুকরো কেটেছে ডেস্কের জন্যে।
— তুমি এর কোণাটা ভেঙে ফেলেছ কেন? – চিৎকার করে উঠল সের‍্যিওঝকা, আর ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকাল, কেন তুমি এর কোণাটা ভেঙেছ? আমি জিজ্ঞেস করছি।
— যীশুর দোহাই, আমায় ক্ষমা করো।
— কাজটা আবার করো।
মাটভে আবার করাত চালালো.. তার পীড়নের আর অন্ত নেই। ডেস্ক বরফের গর্তের ভেতর দাঁড় করানো হলো, এটাকে রঙ করা রিং দিয়ে আবৃত করা হলো; এই ডেস্কে পবিত্র ক্রশ খোদাই করতে হবে, এখানে দাঁড়িয়ে যাজক যীশুর বার্তা প্রচার করবেন খোলা জায়গায়। কিন্তু এইটুকুই শেষ নয়। ডেস্কের পেছনে একটা বড়ো ক্রশ রাখতে হবে যাতে শ্রোতারা দূর থেকে তা দেখতে পায় এবং তা যেন সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে, যেভাবে হিরে কিম্বা রুবির ওপর আলো পড়লে তা ঝিকমিক করে। ক্রশের উপর থাকতে হবে শান্তির প্রতীক একটি পায়রা। এটাকেও বরফের ওপর খোদাই করে তৈরি করতে হবে। চার্চ থেকে জর্ডন পর্যন্ত রাস্তাকে ফার এবং জুনিপার গাছের শাখা প্রশাখা দিয়ে আচ্ছাদিত করতে হবে। এইসবই তাদের করণীয় দায়িত্ব। প্রথমেই সের‍্যিওঝকা তার কাজ শুরু করেছে ডেস্ক তৈরি দিয়ে। সে কাজ শুরু একটা রেতি, ছেনি, বাটালি দিয়ে। সে যথাযথভাবে ডেস্কের ক্রসটি তৈরি করতে সক্ষম হলো, যীশুর সুসমাচার, ঝালর ইত্যাদি ডেস্ক থেকে ঝুলিয়ে রাখা হলো। তারপর সে পায়রা তৈরিতে হাত লাগালো। যখন সে চেষ্টা করছে পায়রাতে একটা নম্রতার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে, মাটভে ভালুকের মতো শ্লথগতিতে কাঠের ক্রশটি তৈরি করছে আর বরফের আস্তরণ দিচ্ছে। সে ক্রসটি নিয়ে গর্তের ভেতর দাঁড় করালো। অপেক্ষা করতে লাগলো জল যেন আরও বরফে পরিণত হয়, তখন সে দ্বিতীয়বার সেটাকে আরও শক্ত করে ঢোকাবে, সে অপেক্ষা করতে লাগলো ক্রশটা যেন আরও মোটা বরফের আস্তরণে মুড়ে দেওয়া যায়। এটা একটা কঠিন কাজ, যার জন্যে খুব বেশি রকমের ধৈর্যের প্রয়োজন।
এখন সেই কঠিন ও সূক্ষ্ম কাজ শেষ হয়েছে। সের‍্যিওঝকা তার গাঁয়ের দিকে ছুটে গেল যেমনটি তার স্বভাব। সে প্রতিজ্ঞা করল, এটাকে আরও সুন্দর করতে না পারলে সে এটাকে নদীর জলে ধুয়ে নেবে। তার জন্যে চাই যথাযথ রঙ। তার পকেটে হালকা বাদামী- হলুদ রঙ, ঘন নীল, লালচে-তামাটে,নীলচে- সবুজ ইত্যাদি রঙের নমুনা। একটি ফার্দিংও মূল্য না দিয়ে সে দোকান থেকে দোকানে ছুটে ছুটে যেতে লাগলো। দোকান মদ্যশালার পাশেই ছিল। সেখানে সে একটি পানীয় নিল, তারপর দাম না দিয়েই হাতে একটা ঢেউ তুলে সে বেরিয়ে গেল। একটি কুটিরে এসে সে পেল বিটরুটের পাতা, আরেকটিতে পেল পেঁয়াজের খোসা, এগুলো দিয়ে সে হলুদ রঙ বানালো। সে শপথ নিল,উল্টোপালটা পা ফেলল, ভয় দেখাল কিন্তু অন্তরাত্মা থেকে কোনও শব্দ নি:সরিত হলো না। সবাই তাকে দেখে হাসছে, সবাই সহানুভূতি অনুভব করছে,তাকে সেরগেই নিকিটিছ বলে ডাকছে; সবাই এটা বুঝতে পারছে, তার এই শৈল্পিক কাজ তার নিজের জন্যে নয়, সবটাই অন্যের জন্যে, একজন তৈরি করে অন্যরা তাকে সাহায্য করে। সের‍্যিওঝকা শিল্পী হিসেবে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবে না, সে মদ্যপ, কথাবার্তায় যা খুশি তাই, অকেজো বলে মনে হয়, কিন্তু যখন তার হাতে কম্পাস, ছেনি ইত্যাদি আসে তখন তার চিন্তা বুদ্ধি উচ্চস্তরে উঠে যায়, তখন সে ঈশ্বরের দাস হয়ে যায়।

এপিফানির ভোর এসে গেল। চার্চের প্রাঙ্গণে, নদীর দুই তীরে, এমনকি অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মানুষের জমায়েত, একেবারে থিকথিকে ভিড়। জর্ডনকে ঘিরে যা কিছু তৈরি হয়েছে সব খুঁটিনাটি একটি নতুন মাদুর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। সের‍্যিওঝকা নম্রভাবেই মাদুরের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভেতরটা তার আবেগে পরিপূর্ণ, সেটাকে নিজের বশে রাখতে সে আপ্রাণ চেষ্টা সে চালিয়ে যাচ্ছে। সে দেখল অন্তত হাজার খানেক লোক এখানে জমায়েত হয়েছে। অনেক মানুষ অন্য এলাকা থেকেও এসেছে। এই মানুষগুলো পায়ে হেঁটে এই শীতে, বরফের ওপর দিয়ে এসেছে শুধু তার তৈরি জর্ডন দেখার জন্যে। মাটভে, যে সবচাইতে কঠিন এবং গোড়ার কাজগুলো করেছে, তাকে আজ দেখাই যাচ্ছে না, তার কোনও কথাও শোনা যাচ্ছে না, সে চার্চের পেছনে রয়েছে, তাকে বুঝি ভুলেই যাওয়া হয়েছে…আজ আবহাওয়া চমৎকার… আকাশ পরিষ্কার। সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে।
চার্চের ঘন্টা বেজে উঠল আর নদীর তীরের পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল।হাজার হাজার মাথা নড়ে উঠলো, হাজার হাজার হাত পবিত্র ক্রশের চিহ্ন আঁকল।
কিন্তু সের‍্যিওঝকা নিজের অসহিষ্ণুতা নিয়ে ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এখন ধর্মীয় সংস্কারের ( Sacrament) ঘন্টা বেজে চলেছে। তারপর আধঘন্টা পর গির্জার ঘন্টাঘরে এবং জমায়েত হওয়া মানুষের মধ্যে একটা আলোড়ন অনুভব করা গেল। একটার পর একটা ব্যানার গির্জা থেকে বেরিয়ে আসছে, আর ঘন্টাধ্বনি আনন্দের বার্তার সূচক হিসেবে দ্রুততালে বেজে চলেছে। সের‍্যিওঝকা উত্তেজনায় কাঁপছে, সে মাদুরটি তুলে নিল… আর জমায়েত হওয়া মানুষ অসাধারণ কিছু দেখতে পেল। সেই ডেস্ক, কাঠের রিং, খুঁটি এবং বরফের তৈরি খুঁটি থেকে এখন নানারঙের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে, আবার সূর্যের ঝিকমিকে আলোয় রঙের বিচ্ছুরণে মনে হচ্ছে রঙ যেন বহুবর্ণে পরিণত হচ্ছে। পবিত্র ক্রশ ও পায়রা থেকে সূর্যের আলো এত উজ্জ্বলভাবে বিচ্ছুরিত হচ্ছে যে, চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছে। দয়ালু ঈশ্বর! এতো সুন্দর হয়েছে এই কাজ! একটি ধ্বনি উঠে আসছে জমায়েত জনতার মধ্যে থেকে। ঘন্টাধ্বনির আওয়াজ আরও উচ্চগ্রামে উঠল, দিন আরও উজ্জ্বল হলো, দোদুল্যমান ব্যানারগুলো ভিড়ের ভেতর ঢেউ তুলল। যাজকদের শোভাযাত্রায় সংকেতবাহী ছবিগুলো এবং যাজকদের পোশাক সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে, এই শোভাযাত্রা ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে এলো এবং জর্ডনের দিকে ঘুরল। হাতগুলো ঢেউ এর মতো ঘন্টাঘরের দিকে ফিরল, ঘন্টাধ্বনি বন্ধ করার জন্যে। যাজকরা তাদের কাজ শুরু করল, ধীরে ধীরে, একের পর এক, খুঁটিনাটি সমস্ত ধর্মীয় আচরণবিধি, সমস্ত অনুষ্ঠানকে দীর্ঘায়িত করা হলো, করা হলো জমায়েত মানুষের মঙ্গলকামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা। জনতা দাঁড়িয়ে নিশ্চুপও স্থানুবৎ।

এখন তারা পবিত্র ক্রশকে নামিয়ে জলে নিমজ্জিত করল। হাওয়ায় বাতাসে একটি অসাধারণ ধ্বনি উঠল। বন্দুক থেকে ফায়ারিং হলো, চার্চের ঘন্টা দ্রুততালে বাজতে লাগল, মানুষের হর্ষধ্বনি শোনা গেল। মানুষ খুঁটিগুলো ছোঁয়ার জন্যে ছুটে আসতে লাগল। সের‍্যিওঝকা এই হর্ষধ্বনি শুনছে, দেখল হাজার হাজার মানুষ তাকে দেখছে। আর শ্লথ মাটভের আত্মা গৌরবে ও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

(জর্ডনঃ- রাশিয়া ইউক্রেন ইত্যাদি দেশে গোঁড়া খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বীরা পুরনো ক্যালেন্ডারের জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে ‘এপিফ্যানি’ ( ব্যাপ্টিজম অফ ক্রাইস্ট) পালন করে। বরফে ঢাকা নদীর বরফ কেটে একটা গোল বৃত্ত এবং ক্রশ তৈরি করে। এই বরফের বৃত্তকে বলা হয় জর্ডন। নামটি সেই জর্ডন নদীর নাম থেকে এসেছে যেখানে যীশু খ্রীস্টকে যোহনের দ্বারা ( John The Baptist) নিমজ্জিত করা হয়েছিল। Baptist করার পর ঈশ্বর পায়রা রূপে নেমে আসেন স্বর্গ থেকে এবং পবিত্র যীশুর আত্মাকে নিয়ে যান। ( বাইবেলের সুসমাচার)। তথ্যসূত্র – অন্তর্জাল।)