ক্ষীরকদম – প্রসেনজিৎ রায়

ক্ষীরকদম – প্রসেনজিৎ রায়

ক্ষীরকদম    (ছোটোগল্প)

প্রসেনজিৎ রায়

আজ বীরেশ্বরবাবুর ৬৫ তম জন্মদিবস। আজকে আবার সরস্বতী পূজাও, আদতে বাঙালির নাকি ভ্যালেন্টাইনস ডে। কিন্তু বীরেশ্বরবাবুর জীবনে সরস্বতী পূজা বা ভ্যালেন্টাইনস ডে কোনোদিনই তেমন অর্থপূর্ণ ছিলো না। আগেকার কড়া মা-বাবার আমলে প্রেম-টেম করার প্রশ্নই উঠতো না। বিয়ে করার আগে স্ত্রী সুপর্ণা দেবীর মুখটাও ঠিকভাবে দেখেননি, শুধু মনে আছে যেদিন দেখতে গেছিলেন সুপর্ণা দেবীকে, সেদিন সুপর্ণা দেবী নিজের হাতে ক্ষীরকদম বানিয়ে খাইয়েছিলেন, সেই স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে। তারপর চাকরিসূত্রে পৈতৃক বাড়িতে থাকার সুযোগই পেতেন না বীরেশ্বরবাবু। পুলিশে চাকরি করতেন, তাই পরিবার, স্ত্রী, সন্তান সাথে থাকলেও কাউকেই ঠিকভাবে সময় দিতে পারেননি। পূজো বা কোনো অনুষ্ঠানে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া তেমনভাবে হয়ে উঠেনি কাজের চাপে। তারপর ছেলেমেয়ে বড়ো হবার পর দায়িত্ব বেড়ে গেলো আরো। সময়, পরিস্থিতি এসবের চাপে বীরেশ্বরবাবুর প্রজন্মের কাছে এই সরস্বতী পূজাটা আর বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে হয়ে উঠেনি। তাদের কাছে স্ত্রীর সাথে একটু খুনশুটি, মিষ্টি করে কথা বলাটাই প্রেম। আর এখন এই বুড়ো বয়সে প্রেম করার ইচ্ছে থাকলেও লোকলজ্জায় সেই ইচ্ছে দমিয়ে রাখতেই হয়। পাঁচ বছর হলো তিনি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। সরস্বতী পূজা এলেই বা অন্য পূজোতেও ছেলেমেয়েরা নিজেদের সন্তানকে বীরেশ্বরবাবুর স্ত্রীর কাছে রেখে যায় যারা স্ত্রী, স্বামী নিয়ে ঘুরতে বেরোয়। এবারও গতকাল মেয়ে জানিয়ে রেখেছে বিকেলে নাতনিকে এনে রেখে যাবে বীরেশ্বরবাবু আর সুপর্ণা দেবীর কাছে। যদিও ইচ্ছে থাকে বুড়ো বয়সে একটু স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন, কোনো মিষ্টির দোকানে ঢুকে ক্ষীরকদম খাবেন সেই প্রথম বিয়ে হবার পর যেভাবে যেতেন, তা আর হয়ে উঠে না। অবশ্য নাতি-নাতনিদের মধ্যে নিজেদের শৈশব খুঁজেও কিছুটা শান্তি মেলে এ প্রৌঢ় দম্পতি যুগলের।
বীরেশ্বরবাবুর জন্মদিন, তার উপর নাতনি, মেয়ে, মেয়ের জামাই আসছে। সুপর্ণা দেবী রান্নাঘরে তাই বিভিন্ন খাবার পদ বানাচ্ছেন। দোতলা বাড়ির বারান্দায় আরাম কেদারায় খানিকটা রোদে আরামে গা হেলিয়ে মোবাইলে কিশোর কুমারের গান শুনছেন বীরেশ্বরবাবু – “জিন্দেগী প্যায়ার কা গীত হ্যান, ইসে হর দিল কো গানা পড়েগা”।
হঠাৎ গলা হেঁকে বললেন, কই গো শুনছো – ক্ষীরকদম বানাচ্ছো তো আজ।
রান্নাঘর থেকে উত্তর এলো, হ্যাঁ গো বানাচ্ছি, তোমার প্রিয় জিনিস তোমাকে বানিয়ে না খাওয়ালে আজ রক্ষে আছে বুঝি….।
হো হো করে দুজনেই হেসে উঠলেন। তারপর আবার বীরেশ্বরবাবু গানে মনোযোগ দিলেন। গান শুনতে শুনতে মনে পড়ে থাকলো ছোটোবেলার কথা। ছোটোবেলা সকালে উঠে স্নান করে উপোস থাকা, অঞ্জলি দেওয়া, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া সারাদিন, সমবয়সী পছন্দের মেয়েকে শাড়ি পরে কি অপূর্ব লাগতো; যদিও দূর থেকে দেখা ছাড়া আর কোনো জো ছিলো না, বন্ধুরা উসকে দিতো এই বীরু এই মাত্র মেয়েটা তোর দিকে তাকিয়েছিলো….আরো কত খুনশুটি। কিভাবে যে এতগুলো দিন কেটে গেলো, সেই বছর সতেরোর বীরু আজ ৬৫ বছরের বৃদ্ধ বীরেশ্বর রায়। সেই বন্ধুরা আজ কে কোথায়, অনেকে ইহলোকের মায়া ত্যাগও করেছে। সেসব ভাবতে ভাবতে ভিতরটা যেনো কেঁপে উঠলো বীরেশ্বরবাবুর। সত্যি সময়ের মতো নিষ্ঠুর কেউ নেই।
হঠাৎ করে গানটা থেমে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। বীরেশ্বরবাবুর পিসতুতো ছোটো ভাই অমিত আর নেই। গতকাল রাতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে….
অমিত আর্মিতে চাকরি করতো। দুমাস আগে রিটায়ার করলো। নিজের ভাই না হয়েও খুব কাছের ছিলো। কোনো কিছু করার আগেই বীরেশ্বরবাবুকে জিজ্ঞেস করতো একবার হলেও। চাকরিসূত্রে সারাটা জীবন বাইরে কাটালো অমিত। বলেছিলো এবার অবসর জীবনে পরিবার কে নিয়ে জীবন উপভোগ করবে। আর কিছুই হলো না ওর ইচ্ছাপূরণ। পরিস্থিতির এক নিটোল পরিবর্তনে অমিতের কথা ভেবে কেমন গুমরে গেলেন বীরেশ্বরবাবু। বোধ ফিরলো মেয়েদের বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ায় কলিংবেলের শব্দে। জামাই এসে প্রণাম করলো। সবার সাথে কথা বললেও অমিতের কথা ভেবে শান্তি পাচ্ছিলেন না মনে। হঠাৎ বললেল – আমি একটু বেরোবো কাজ আছে। সবাই কারণ জিজ্ঞেস করলে বললেন – এলেই দেখবে, বলেই তৈরি হয়ে বেরিয়ে গেলেন।
অমিতবাবুর ঘটনায় বাড়ির সবারই মন খারাপ। এর মাঝে বীরেশ্বরবাবু হঠাৎ কোথায় বেরোলেন সবাই চিন্তিত। বীরেশ্বরবাবুর ছেলে ফোন করে দেখলেন মোবাইলটা ঘরেই পড়ে আছে। প্রায় মিনিট চল্লিশ পর বীরেশ্বরবাবু বাড়ি ফিরলেন, হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ আর খোঁপায় বাঁধার রজনীগন্ধা ফুল। সবাই অবাক। বীরেশ্বরবাবু হাসিমুখে বললেন – অবাক হবার কিছু নেই, সারাটা জীবন দিয়ে গেলাম পরিবারকে, এখন আমি আর তোদের মা বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন করবো আজ। কথাটা শুনে লজ্জায় জিভ কামড়ে সুপর্ণা দেবী বললেন – কি বলছো জামাইদের সামনে?
বীরেশ্বরবাবু বললেন – আরে কিসের লজ্জা, আমি আমার বৌয়ের সাথে ঘুরবো। এই নাও হলুদ রংয়া শাড়ি। আমি হলুদ পাঞ্জাবিটা পড়বো আর তুমি এটা, আর এইটা তোমার খোঁপায় বাঁধবো আজ। বলে রজনীগন্ধাটা দেখালেন।
সুপর্ণাদেবী বললেন – আরে ছাড়ো এসব, রান্নাবান্না বাকি, তোমার ক্ষীরকদমও বাকি বানানো এখনও মশাই …।
বীরেশ্বরবাবু বললেন – আরে ছাড়ো তো, রান্নাবান্না বৌমা আর তিন্নি মিলে করবে, তোমায় করতে হবে না আজ, তুমি বরং তৈরি হতে শুরু করো, আর ক্ষীরকদম না হয় আজ রেস্টুরেন্টেই খাবো সু….
তিন্নি আর বৌমা বলে উঠলো একসাথে – আজ তবে মা-কে আমরাই সাজিয়ে দেবো দুজনে…