মংলুর একদিন – ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য্য

মংলুর একদিন   (ছোটোগল্প)

ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য্য

ওর বাপের হাতেই খুন হোলো ঠুমকি। ধারালো হাঁসুয়ার এক কোপে কচি বাঁশের মতো লিকলিকে ঘাড়টা ঝুলে পড়েছিল।
তিন বছরের ঠুমকি, হাড় জিলজিলে চেহারায় অনাহারের সহাস্য উপস্থিতি সর্বাঙ্গে। আর পাঁচটা গণ্ড বাচ্চাদের মতই কোমরে বাঁধা থাকত এক টুকরো কাপড়, লজ্জাবস্ত্র বলতে এইটুকুই।
ঠুমকি মারা গেছে আজ বিকালে। হাঁসুয়াটা ছুঁড়েছিল ওর বাপ, মংলু। উঠানে বসে কাঁদছিল ঠুমকি। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে এমন দৃশ্য দেখে মেজাজ হারায় মংলু। আর পাঁচটা দিনের মতো তো আজকের দিনটা শুধুই অনাহারের রক্তচক্ষু দেখে কাটেনি, বঞ্চনার কষাঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। অন্যদিন হলে হয়তো মেয়ের কান্না দেখে মুখ ফিরিয়ে কথা ফেলত সুখিয়ার গায়ে। আজ পারেনি সে কাজ করতে। পুরুষানুক্রমে চাষ করে আসা জমি খনিবাবুদের খনকযন্ত্রের দানব নখের আঁচড়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে চোখের সামনে। সামান্য শস্য পাওয়ার আশাটুকুও শেষ হয়ে গেছে চিরতরে। এমন দিনে মেয়ের খিদের কান্না বাপের বুকে আগুন জ্বালায় বইকি। তাই ঠুমকির কান্নার রেশ ধরেই নিজের ভাগ্যকে অভিসম্পাত করে মংলু। ভাগ্য দেবতার কাছে উগরে দেয় মনের তীব্র ক্ষোভ। গণ্ডদের জীবনের ছায়াসঙ্গী এই নিদারুণ বঞ্চনা কি চিরন্তন? হাঁসুয়া উঁচিয়ে প্রশ্ন ছোঁড়ে মংলু অদৃষ্টের দেবতার কাছে। আর তখনি হাঁসুয়া ফসকে ঘটে গেল এই মর্মান্তিক কাণ্ড।
দাওয়ায় বসে ছিলো সুখিয়া, মংলুর বউ। এমন ঘটনা তার কল্পনার অতীত। চোখের সামনে সন্তানের মরণ কি সহ্য করা যায়! সুখিয়ার গগনভেদী চিৎকার ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলের নীচে ঝিমিয়ে থাকা গণ্ডদের গ্রামগুলিতে। এমনিতেই শাল সারাইয়ের নীচের গ্রামগুলি তখন জমি হারানোর শোকে কাতর। সুখিয়ার চিৎকারে জেগে উঠেছে সবাই। বাপের হাতে মেয়ের খুন! এমন ঘটনা দেখা তো দূরের কথা শোনেওনি কেউ। তাই ভরে ওঠে মংলুর উঠান কিছুক্ষণের মধ্যেই। সুখিয়াকে ঘিরে থাকে বেশ কিছু মহিলা। উঠানের এক পাশে বসেছিল মংলু। মনের ক্রোধ থিতিয়ে এসেছে ততক্ষণে। গ্রামবাসীদের নিন্দা আর গঞ্জনায় মনের মধ্যে মোচড় দেওয়া যন্ত্রণা আটকা পড়েছে বুকে। পথ পায়নি বাইরে বের হবার।

তবে এ কাজের জন্য পুলিশি সাজা পেতে হবে না মংলুকে। শহর থেকে বহু দূরে গণ্ডদের খবর পৌঁছায় না সভ্য জগতে। সীমাহীন দারিদ্র্যে মানুষ যেখানে না খেয়ে মরে সেখানে একটা বাচ্চা মেয়ের মরণে আশ্চর্য হবার আর কিই বা থাকে? কাজেই মংলুর সাজা পাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে মংলুর যে সাজা পাওয়া উচিত এ ব্যাপারে একমত গ্রামের মাতব্বররা। আজ সমস্ত কিছুই চাপা পড়েছে ঠুমকির মরণের বীভৎসতায়। সে বিচার হবে অন্য দিন।
এমনিতে মৃত্যু নিয়ে বিশেষ কৌতূহল দেখানোর অভ্যাস গণ্ডদের নেই। বিশেষত বাচ্চা ছেলেমেয়ের মরণকে গণ্ডরা ভবিতব্য বলেই মেনে নিয়েছে। এখানে রোগ বলাই এ বাচ্চা মরে। সাপের ছোবলেও মরে। তবে সে তো অদৃষ্টের লিখন। সংসারে যে দেয় সেই যখন নেয় সে নেওয়ায় মানুষের কিছু করার থাকে না। তাই মরণকে সহজেই মেনে নেয় গণ্ডরা। তাছাড়াও মরণ আসে, আরও নির্মম ভাবে আসে। অনাহারের ছোবল নীল করে দিয়ে যায় গণ্ড বাচ্চাদের, বুড়োদেরও। যেখানে একবেলার খাবার জোটে না রোজ, সেখানে অনাহারের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণকে না মেনে উপায় কি? তখন ভাগ্য দেবতাকে দোষ দেয় ওরা। চোখের জল ফেলে নিজেদের ভাগ্যের কথা ভেবে। তবে ওই পর্যন্তই। বুড়ো আর বাচ্চা যে বাড়িতে মরে শোকের বাতাস ঘুরপাক খায় সে বাড়ি ঘিরেই। জীবন যেখানে অনাহারের দাপটে বুকে হাঁটে, সেখানে বাঁচা আর না বাঁচার মধ্যে দৃশ্যমান কোনো ব্যবধান নেই। সেখানে অপরের মরণে কাঁদবার বিলাসিতা দেখানোর ফুরসত কোথায়? রোজ দিন বেঁচে থাকার পাথুরে সংগ্রামের মাঝে অবসর কোথায় মরণ নিয়ে কৌতূহল দেখানোর। তাই ছেলে বুড়োর মৃত্যু ওদের অনুভূতিতে নতুন শিহরণ জাগায় না। তেমন মরণের খবর শুনে পাশ কাটিয়েই চলে যায় গণ্ডরা। তবে ঠুমকির বেলায় হয়নি এমনটা।
পাঁচটা গ্রামের মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে মংলুর উঠানে। সহানুভূতি আর নিন্দা দুটোই রেখে গেছে তারা। পড়শিদের কেউ কেউ খুনি বলেই ডেকেছে মংলুকে।

সন্ধ্যা নেমেছে গ্রামে। কয়েক ঘন্টার সহানুভূতি, গঞ্জনা, হা-হুতাশ সব কিছুই শেষ হয়েছে ঠুমকির কবরে। মংলুর উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে অজস্র পল্লব মহুয়াগাছটি। তার পাশেই কবরে পুঁতে দেওয়া হয়েছে ঠুমকিকে। গণ্ডরা বাচ্চা আর পোয়াতি মেয়েদের দাহ করে না, কবর দেয়। গ্রামের প্রধান পুরোহিত, দেবারির উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় সেই কাজ। গণ্ডদের দেবতা বড়োদেওকে স্মরণ করে কবরের একপাশে পুঁতে দেয় একটা বড়ো পাথরের টুকরো, মৃতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। গণ্ডরা বলে উরশকাল। ঠুমকির বেলায় ব্যতিক্রম হয়নি সেইসব নিয়মের। সমস্ত কাজ শেষ করেছে পড়শিরা। মংলুর বাড়ি ছাড়ার আগে ঠুমকির কবরের উপরে বেশ উঁচু করে চাপিয়ে দিয়ে গেছে মাটি। রাতের বেলায় বুনো জন্তুর দল টের পেলেই মাটি খুঁড়ে বের করে আনবে কবরে থাকা মৃতদেহ, ছিঁড়ে খাবে।
মংলুর বাড়ির পাশেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। শাল, মহুয়া, অর্জুন, সারাই গাছগুলি হাত ধরাধরি করে চলে গেছে আরো গভীর জঙ্গলের দিকে। রাত বিরেতে বুনো জন্তুর উৎপাত লেগেই থাকে তাই।
দাওয়ায় বসে মংলু। শূন্য বাড়িটায় পাক খেয়ে বেড়ায় সুখিয়ার কান্না। সঙ্গে বের হয়ে আসে যন্ত্রণাকাতর দূর্বোধ্য শব্দ। ঠুমকির কবর আগলে পড়ে ছিল সুখিয়া। কখনো কখনো সংজ্ঞাহীন। এ সময়ে চরম কিছু করে ফেলা আশ্চর্যের নয়। তাই জোর করে সুখিয়াকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে পাড়ার লোকজন। সেই থেকে ঘরের আঁধারে রয়েছে সে। আর দাওয়ায় বসে মংলু। মনে বয়ে চলে আপশোশের ফল্গুধারা। অপরাধ বোধ জাগ্রত হয় মনে। সব মিলে সে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা মংলুর। মস্তিষ্কের সমস্ত প্রকোষ্ঠে দাপিয়ে বেড়ায় পড়শিদের ধিক্কার। বারবার কানে ভেসে আসে ‘খুনি মংলু’। বাপ হয়ে কি নিজের মেয়েকে খুন করা যায়? অসহায় মংলু মাথা নত করে সমস্ত অভিযোগের কাছে। এ যেনো নির্মম আত্মসমর্পণ।
সন্ধ্যার ডাকে সাড়া দিয়ে নেমে এসেছে রাত। আধখানা চাঁদের আলোয় ভিজে গেছে প্রকৃতি। নিঝুম অরণ্যের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে যন্ত্রণাকাতর গ্রাম। বনের খেয়ালি বাতাস বয়ে যায় আপন খেয়ালে। উঁচু উঁচু গাছের মাথাগুলি দুলতে থাকে একতালে। পেঁজা তুলোর মত মেঘ ভেসে যায় কোন সে অচিন দেশে। পাতায় পাতায় শিস দিয়ে দুলে ওঠে মহুয়াগাছের ডালগুলি। মংলুর উঠানে বিছানো মহুয়া গাছের ছায়াটি কাঁপতে থাকে, অশরীরী ছায়া যেনো। মংলুর দৃষ্টি নিথর হয় দূরের ওই পাহাড়ের গায়ে। গগনচুম্বী পাহাড়টা দাঁড়িয়ে রয়েছে দিগন্তকে আড়াল করে। চাঁদের আলোয় অবয়ব টুকুই বোঝা যায় শুধু। ওই পাহাড়ের কোলেই ছিলো মংলুদের গ্রাম। ওই পাহাড়ের বুকেই ছিল গন্ডদের প্রাণ প্রাচুর্য্, বেঁচে থাকার উপাদান, উৎসবের ঝাড়বাতি। সেই দিন আর নেই। কতো কিছুই ঘটে গেছে এই কয় বছরে। একদিক থেকে ধীরে ধীরে কাটা পড়েছে পাহাড়টা। গভীর রাতে পাহাড়ের কান্না শুনতে পায় মংলুরা। পাহাড়ের চারপাশের সবুজের প্রলেপ আজ ফিকে। পাহাড় ছেড়ে সরে আসতে হয়েছে গন্ডদের। আর নিঃশব্দে বিপর্যয় গ্রাস করেছে তাদের জীবনকে। বেঁচে থাকার লড়াই হয়ে উঠেছে দূরহ। কেউ ভাবেনি গন্ডদের কথা। মুনাফালোভী মানুষ ওই পাহাড়ের গর্ভে পেয়েছে লোহার সন্ধান। লোহার চেয়ে কি মানুষ মূল্যবান হয়? হয় না কোনোদিন।

নিষ্প্রদীপ ঘরে রয়েছে সুখিয়া। দাওয়া থেকে মংলু দেখতে চায় তাকে। ঘরের আঁধারে পথ হারায় মংলুর দৃষ্টি। সুখিয়া রয়ে যায় অদেখা। আঁধার ঘরটি যেনো যন্ত্রণার গর্ভগৃহ। চলকে চলকে বাইরে আসে সুখিয়ার যন্ত্রণা। বিকেল থেকে ধারাবাহিক অশ্রুবর্ষণে অশ্রু যেনো অবশিষ্ট নেই আর। তাই অসীম বেদনা শুকনো কান্নার গা জড়িয়ে আসে বাইরে। বড়ো কষ্ট পায় মংলু। বড়ো কষ্ট। সাধ হয় সুখিয়ার পাশে থেকে পারস্পরিক সহমর্মিতায় উথালপাতাল এ শোকের সাগরে ভেসে চলার। ঠুমকি নেই, এ ক্ষতি তো একা সুখিয়ার নয়। এ তো তাদের দুজনের জীবনে অপ্রত্যাশিত মর্মান্তিক ছন্দপতন। ইচ্ছে যায় মংলুর বুকের মধ্যে জমে থাকা গ্লানির দলাগুলিকে টেনে বের করে আনতে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে যায় সে খুনি নয়। যা কিছু ঘটেছে সবই প্রবাহমান ঘটনার তোড়ে। কিন্তু বলবে কাকে মংলু? শুনবেই বা কে? জঙ্গল কি আর কথা কয়! সুখিয়া তো শোকমগ্না। আটকে রয়েছে অদ্ভুত এক বিকারের ঘূর্ণিপাকে। সেখানে সংজ্ঞা থাকা আর না থাকার মধ্যে তফাত কোথায়। নিজের বুকের আগুন দমিয়ে রেখে সুখিয়ার জন্য সান্ত্বনার ভাষা খোঁজে মংলু। সংসারে এ এক নিষ্ঠুর বৈষম্য। শোকের ঝড় আছড়ে পড়ে স্বামী স্ত্রী দুয়ের বুকেই, তবুও কোন সে নিয়মে স্ত্রীর ক্ষতই বেশি যন্ত্রণার দাবী তোলে। আর পুরুষের অব্যক্ত যন্ত্রণা পথ খুঁজে মরে পুরুষের বুকেই। আজ তেমনই এক পরিস্থিতির কাছে পর্যুদস্ত মংলু। বিষণ্ণ হাহাকার পাক খেয়ে ওঠে মংলুর মনে। জোৎস্নায় দেখা যায় ঠুমকির কবর। চেয়ে থাকে মংলু। মহুয়াগছের পাতার ফোকর গলে নেমে আসে আলোর ছটা। মনে হয় কে যেনো সাজিয়ে দিয়েছে কবরটাকে মায়াবী আলোক মালায়। অশেষ অনুশোচনা জাপটে ধরে মংলুকে। চোখ বন্ধ করে। পাশেই পরে থাকা হাঁসুয়াটার স্পর্শ পায় হাতে। আলো আঁধারে তাকিয়ে দেখে হাঁসুয়াটাকে। পড়শিদেরই কেউ সেটিকে রেখে গেছে মংলুর পাশে। বাপ হয়ে যে মেয়েকে মেরে ফেলতে পারে তার কর্তব্য কি সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছে তারা। হাঁসুয়া হাতে তোলে মংলু। সারা শরীরে শোনিত প্রবাহের সঙ্গে বইতে থাকে তীব্র পাপবোধ। শরীরের স্নায়ুগুলি হয়ে ওঠে সতেজ। ঠিক তখনই থমকে দাঁড়ায় মংলুর মনের গতি। কে যেনো ডাকে, মংলু…
চমকে ওঠে মংলু। উঠানের আবছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ। প্রথমে চিনতে পারেনি। পরে বুঝতে পারে। বাজু ওঝা এসেছে। আশে পাশের সব গ্রামের ভরসা এই বাজু। মঙ্গল অমঙ্গল বিষয়ে সবাই মত নেয় বাজুর। পোয়াতির শরীর শুকিয়ে যাওয়া, ফসল মরক লাগা, ডাইনি তাড়ানো সব কাজেই ওস্তাদ বাজু। এগিয়ে এসে মংলুর পাশে বসে বাজু। বলে, মেয়েটা তোর অপঘাতে মরেছে। প্রতিকার না করলে ডাইনি হয়ে…
ভয়ে বুক শুকিয়ে আসে মংলুর। এটা রাখ, বলে প্রতিকারের বস্তু দেয় বাজু মংলুর হাতে। ভোর রাতে পাহাত সুকুম উঠলে ওই বস্তু পুঁতে দিতে হবে কবরে, সঙ্গে হাঁসুয়াটাও। শুকতারাকে গন্ডরা বলে পাহাত সুকুম। চলে যায় বাজু। ভাবে মংলু যে হাঁসুয়ার আঘাতে প্রাণ গেলো ঠুমকির সেই হাঁসুয়া পুঁতেই মিলবে ঠুমকির আত্মার মুক্তি! গলায় আটকে থাকা যন্ত্রণার দলাটা বাইরে বের হয়ে আসে এইবার। শান্ত প্রকৃতির নিস্তব্ধতায় ফুঁপিয়ে ওঠে মংলু। এই প্রথম সশব্দে কেঁদে ওঠে। দু হাত চাপা দেয় মুখে। থর থর করে কাঁপতে থাকে শরীরটা।
দূরে ওই পাহাড়ের মাথায় আটকা পড়েছে চাঁদ। জঙ্গলের বাতাস ছুঁয়ে যায় মংলুকে। জিজ্ঞাসা শূন্য চাউনি নিথর পুব আকাশের বুকে। দৃশ্যমান বস্তুগুলি মংলুর চেতনায় উপলব্ধির কোনো সংকেত পাঠায় না। শুধু উপলব্ধ যন্ত্রণাই ফুটে ওঠে জাগতিক বস্তুর দর্শনে।
বহু দূরের কোনো গ্রাম থেকে ভেসে আসে ঢোল বাজানোর শব্দ। জঙ্গলের বাতাস কেটে ভেসে আসা সেই ঢোলের বোল মহুয়া ফুলের মিষ্টি গন্ধ মেখে দুখের পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায় মংলুর সলতে পোড়া বুকে। সুলফির নেশায় মত্ত হয়ে দূরে কোথাও ঢোল বাজায় ঢুলিয়ারা। আজ এই সব কিছুই বিদ্রুপ মনে হয় মংলুর। কাল কাটিপন্ডুম, ফসল কাটার উৎসব। জোৎস্নায় ভিজে ফসল কাটার আগের রাতে উৎসব পালন করে গন্ডরা। এ বছর হবে না সে সব কিছুই। নতুন ফসল ছাড়া কি পন্ডুম হয়?

নক্ষত্রদের আনাগোনায় গভীর হয় রাত। ঢোলের শব্দ শোনা যায় না আর। জঙ্গলের গভীরে ক্ষীণ কান্নার সুর শুনে উঠে দাঁড়ায় মংলু। ঠুমকির কান্না। অনাহারের করুণ সুর। দিনের আলোয় কান পাতলেও শোনা যায়, দৈনিক জীবন যাত্রার আবহে কেঁদেই চলে বাচ্চারা। আর অভ্যাস বসে গন্ড মায়েরা বুকে তুলে নেয় আপন সন্তানকে। সারা বছর কোনোদিন আধপেটা কোনোদিন বা না খাওয়া মায়েদের শরীরেও তো অমৃতের যোগান সীমিত। বাচ্চার পেট ভরানোর দুধ কি থাকে সেই বুকে! তাই বাচ্চারা কেঁদেই চলে। মুখের লালায় কি পেট ভরে বাচ্চার? ভরে না।
সারাদিন কেমন ভাবে কেটে গেছে ভাববার কোনো অবকাশ পায়নি মংলু। কার ইঙ্গিতে একটার পর একটা ঘটনা ঘটে গেছে সকাল থেকে। ভাবে মংলু, কোন দুষ্ট গ্রহের পূর্ণ দৃষ্টি পড়লে এমন দিন আসে!
আজ সাত সকালেই খবর এসেছিলো গ্রামে পাহাড়ের কাছে গন্ডদের জমির দখল নেবে লোহা খনিরবাবুরা। এতো কাল ধরে সেখানে চাষ করে এসেছে গন্ডরা। ফসল সামান্যই মেলে। কয়েক মাসের পেট চলে কোনো মতে। সামান্য কোদো আর কুতকি। কখনো ধান ও পেয়েছে। শস্য বলতে এই। তবুও যত সামান্য হোক পরিশ্রমের ফসলের মূল্য থাকে বইকি। সেই জমির দখল নেবে লোহা কোম্পানি। ওই পাহাড়ের লোহার কদর নাকি ভীষণ। তাই দায়িত্বও বেড়েছে কোম্পানির। সেই বাড়তি দায়িত্বের দায় সামলাতেই প্রয়োজন জমি।
খবর পেয়েই দলে দলে হাজির হয় গন্ডরা। অনুরোধ, প্রতিরোধ কোনো কিছুই ধোপে টেকেনি। বড়ো বড়ো লোহার খাম্বার গায়ে জড়ানো তার কাঁটার ওপারে চলে গেলো মংলুদের জমি। মালিকানার বদল হোলো অবলীলায়। নিঃশব্দে নিঃস্ব হোলো গন্ডরা। সামান্য শস্য, তাও জুটবে না আর? এমন শুখা দিন আগে আসেনি কখনো। শুধু কেঁদু পাতা আর করঞ্জা ফল, বনের কাঠ বেচে কি পেট চলে?
বিপর্যস্ত গন্ডরা গ্রামের পথ ধরে। জঙ্গলের মধ্যে সিঁথির মতো সরু পথ। সার বেঁধে চলে সবাই। শবের মিছিল যেনো, এগিয়ে চলে নিশ্চিত অনাহারের উপত্যকার দিকে। সবার পিছনে হাঁটে মংলু। চিন্তায় দীর্ণ। বাড়িতে তিন তিনটে পেট, চলবে কি ভাবে? নিঝুম জঙ্গলে শুকনো পাতার মর মর শব্দ রিক্ততার কথা বলে। সায় দেয় মংলুর ভাবনায়।
পশ্চিম দিগন্তে লালচে আভার আঁচড় টেনে বিদায় নিয়েছে সূর্য। মংলুদের গ্রামে ফেরবার আগেই জমি হারানোর খবর পৌঁছে গেছে। তাই দিন শেষের আগেই রাতের নিশুতি গ্রাস করেছে গ্রামগুলিকে।
বাড়ির উঠানে পা রাখে মংলু। দাওয়ায় বসে সুখিয়া। ভাবী দিনের দুর্ভাবনায় আনমনা। উঠানে বসে কেঁদে চলেছে ঠুমকি। সে দৃশ্য মংলুর বুকে বাজে আজ। মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনাগত দিনের অনাহারের ভয়াল চিত্র। সারাদিন যে তুষাগ্নি জ্বলছিল ধিকিধিকি, ঠুমকির কান্নার বাতাস পেয়ে দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সে আগুন মংলুর দেহে। ভীষণ রাগে দিগবিদিগ জ্ঞান হারায়। হাতের হাঁসুয়া শূন্যে ঘুরিয়ে এমন নির্মমতার জবাব চায় অদৃষ্টের দেবতার কাছে। আর ঠিক তখনই ফসকে যায় হাঁসুয়া, সোজা এসে আঘাত করে ঠুমকিকে। শেষ হয়ে যায় সব। আড়ালে মুচকি হেসে ওঠে আকাশের দেবতা। যেনো সংসারে একটা পেট কমিয়ে ঘুষ দিলো মংলুকে।
মহুয়া গাছের গায়ে ঠেস দেয় মংলু। আলোছায়ায় তাকে মনে হয় প্রস্তর মূর্তি, আমর্ম যন্ত্রণা লেপটে বসে আছে।
রাত্রি এগিয়ে চলে শেষের দিকে। বিষণ্ণ মনে শুকতারার আভাস খোঁজে মংলু।
উদার আকাশে আবছা সোনালি আভাটুকু রেখে নিদ্রা গেছে চাঁদ। সারা দিনের চলে যাওয়া মুহূর্তগুলি ফিরে ফিরে আসে আবার। নির্মম বঞ্চনার প্রভাতী আহ্বানে যে সূর্য উঠেছিলো আজ, অস্তাচলের আগে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে অপূরণীয় শোকের রাগে। ঠুমকি নেই আর। মংলুর অনাবৃত উপলব্ধি নতুন অনুভূতির কথা শোনায়। মংলুর সংসারে অভাব আছে, থাকবেও চিরকাল। সে তো যাবার নয়। তবুও ছোট্ট ঘরে কোথাও যেনো এক চিলতে সুখও ছিলো। আলাদা করে সে সুখ গায়ে মাখা হয়ে ওঠেনি, নেওয়া হয়নি সে সুখের ঘ্রাণ। পাওয়া আর না পাওয়ার তীব্র সংঘাতে ব্যস্ত জীবন যেনো ভুলেই ছিলো সে সুখের উপস্থিতি। বিপুল শোকের মাঝে হারিয়ে যাওয়া মরুদ্যানের কথা মনে আসে মংলুর। হঠাৎ ভবনায় ছেদ পরে। একটা শব্দ কানে আসে। সজাগ হয়ে দু পা সামনে যায় মংলু। আর ঠিক তখনই শব্দ তুলে দৌড়ে পালায়। বুনো শুয়োরের দল।
হাঁসুয়া পাশে রেখে বসে মংলু। হারিয়ে যায় শোকের সাগরে। রাত প্রায় শেষ প্রহরে পা ফেলেছে। পুব আকাশে আসবে এইবার পাহাত সুকুম। ক্লান্ত মংলু হার মানে প্রত্যাহত নিদ্রার কাছে। দু চোখে নেমে আসে ঘুম। আচমকা ঘুম ভাঙ্গে, তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে দেখে ঠুমকির কবরের ওপাশে কি যেনো রয়েছে, অস্পষ্ট। বুনো জন্তু হয়তো। ওত পেতে ছিলো পাশেই। নিঃশব্দে হাঁসুয়া তুলে নেয় মংলু। তীব্র ক্রোধে ছুঁড়ে মারে সেই জন্তুকে লক্ষ্য করে। আর তখনই রাতের নিঝুমতা ভেঙে আর্তনাদ করে ওঠে সুখিয়া। জঙ্গল কাঁপিয়ে ভেসে যায় সুখিয়ার চিৎকার দূরে আরো দূরে। হাত পা অবশ হয়ে আসে মংলুর। নিভে যাওয়া মাতৃত্বের প্রদীপটুকু নিয়ে ঠুমকির কবরের পাশে এসে বসে ছিল সুখিয়া, তন্দ্রাচ্ছন্নতায় টের পায়নি মংলু। বুনো জন্তু ভেবে…
দিনশেষের অপরাধের সাজা নেমে আসে রাতের শেষে। আকাশের দেবতা আবারও বুঝি মুচকি হাসে মংলুর দিকে চেয়ে। নিঃশব্দের পৃথিবীতে ফুটে ওঠে পাহাত সুকুম। চেয়ে থাকে নিঃস্ব মংলুর দিকে।