মৌমাছি – ফজু আলিভা  

মৌমাছি – ফজু আলিভা  

মৌমাছি

ফজু আলিভা

(রাশিয়ান গল্প, ইংরেজি থেকে অনুবাদঃ সদানন্দ সিংহ)

যখনই আমি কারুর মুখ থেকে “মৌমাছি” শব্দটি শুনি, তখনই  আমাকে এই শব্দটি নিয়ে যায় এক উষ্ণ গ্রীষ্মের দিন, খালি পা এবং সূর্যের নীচে জ্বলজ্বল করা হাঁটু-উঁচু ঘাস এবং ফুল সহ এক সুন্দর তৃণভূমির পরিবেশে। হয়তো দূরে সাদা, তুষার-শীর্ষ এক পাহাড় নীল আকাশের দিকে উঠে গেছে। আর স্কাইলার্ক পাখির গান, ফড়িংয়ের ডানাঝাপটানি, মৌমাছির গুনগুন – সব মিলিয়ে এক গ্রীষ্মের সুরসঙ্গীত রচনায় যোগ দিয়ে চলে। আমি তখন আমার মধ্যে নেই। আমার পরিবর্তে কিছু আলো আছে, এমন কিছু একটা আকাশ থেকে নেমে এসেছে এবং সেখানে ফিরে যাওয়ার আবার চেষ্টা করছে। আমি অবিকল অপূর্ণ ডানাওয়ালা নতুন উড়তে শেখা একটি পাখির মতো, উড়ে যাওয়ার জন্য সমস্ত উদগ্রীবতা দেখাচ্ছি। প্রতিটি ফুল আমার দিকে মাথা নাড়িয়ে হাসছে। সাদা ডেইজি ফুল তাদের হলুদ হৃদয় নিয়ে হাসছে, টিউলিপস হাসছে তাদের লাল পাপড়ি এবং কোমল বেগুনি সুন্দর মুখে। আমিও, হাসি। আমি দৌড়োই এবং গান গাই। এক ফসল কাঁটা ধূ ধূ মাঠ আমার সামনে খুলে যায়। কাটা ফুল এবং ঘাস সারি সারি পড়ে থাকে। আমার হৃৎপিণ্ড বেদনায় সংকুচিত হয়। চারিদিকের সুগন্ধ আরও বেশি মায়াবী করে তোলে। সম্ভবত, ফুড়িয়ে যাওয়ার সম্পর্কে তারা সচেতন শেষপর্যন্ত, তারা তাদের সমস্ত সৌন্দর্যের ভাণ্ডারটুকু বিলিয়ে দিতে তাড়াহুড়ো করে চলেছে। আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া ফুলগুলো আর কিছুদিন পরে হাসবে না। উঁচু আকাশে স্কাইলার্কের গানগুলিও যেন এখন দুঃখের। ফুলের তৃণভূমিতে আমার যে ক্ষণস্থায়ী, অনির্বচনীয় অনুভূতি ছিল তাও এখন হারিয়ে গেছে।

– “এখানে এসো!” মহিলারা আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠল।
সামনে এগিয়ে পুরুষরা স্কাইথের ব্লেডগুলি দিয়ে ডান প্রান্ত থেকে বাম প্রান্তে ঘাস পরিষ্কার করে চলছে। পেছন পেছন মহিলারা, মাটিতে নিচু হয়ে, তাদের কাস্তে দিয়ে দুপাশে সেগুলি সাজিয়ে রাখছে।।
– “দেখো, একটি মৌচাক!” সপিনাত চিৎকার করে ওঠে।
সমস্ত মহিলারা তাদের কাস্তে নিক্ষেপ করে তার কাছে ছুটে যায়। মৌমাছিরা আমাদের চারপাশে গুঞ্জন করে তাদের একটি পুরো ঝাঁক নিয়ে উড়ছে। এতগুলি মোমাছি কীভাবে এত ছোট মৌচাকের ভিতরে বসবাস করছে ?

এখন মৌচাকটি সাপিনাতের কাঁটা ঘাসে পড়ে আছে। এই মৌমাছির মৌচাক-দুর্গে শত শত প্রকোষ্ঠে রঙিন মধুতে পরিপূর্ণ।

– “প্রতি বছর আমরা এখানে মৌচাক খুঁজে পাই,” বলেই খাদিজাত এক টুকরো মৌচাক ভাঙে। কয়েক ফোঁটা মধু নিচে গড়িয়ে পড়ে
– “এটা মধু নয়, মেয়েরা, এগুলি গরীব মৌমাছির কান্না,” রুকিয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে। “ভাবো তো, এই সমস্ত কোষগুলি পূরণ করতে তাদের কত না পরিশ্রম করতে হয়েছিল।”
– “আপনি সবসময় কিছু অভিনব ধারণা নিয়ে বেরিয়ে আসেন! আপনি নিজেই একটি কান্নাকাটি করা শিশু, যে কোনও বিষয়ে চোখের জল ফেলতে প্রস্তুত। আপনার কথা অনুযায়ী আমাদের ঘাস কাটা এবং মধু খাওয়া যেন উচিত নয়,” নাতিমত হাসে। কিন্তু কথাগুলি শুনে আমার যে হাত দিয়ে এক টুকরো মৌচাক আমার মুখের দিকে যাচ্ছিল সেটা মাঝখানে থেমে যায়। আমি আমার হাতের তালুর দিকে তাকাই – মধুর ফোঁটাগুলো সত্যিই চোখের জলের মতো লাগে।
– “খাও, খাও। মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে, এটা তাদের জন্য ভালবাসার পরিশ্রম,” বুড়ো আশাকাতুন বলে। “দেখো মৌমাছিটি কত ছোট, কিন্তু কী মিষ্টি মধু তৈরি করে! তোমার কি মনে হয় না জীবনের অর্থ এখানেই নিহিত? মানুষেরও উচিত অন্যের জন্য ভালো কিছু করা। আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম তখন আমি এটা বুঝিনি, কিন্তু যত বড় হচ্ছি ততই আমার মনে হচ্ছে এভাবেই হওয়া উচিত। একটা ঘটনা বলি। একবার, এক গ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া এক অপরিচিত লোক একটি শবযাত্রা দেখতে পেল। ‘মৃত ব্যক্তি কি জীবিত নাকি মৃত?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তাকে একজন বলল, ‘একজন মৃত মানুষ কিভাবে জীবিত হতে পারে?’ ‘যথেষ্ট সহজ’, অপরিচিত উত্তর দিল, ‘তিনি যদি তার জীবনে ভালো কিছু করে থাকেন, তিনি যদি জানতেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে শব্দ ও জ্ঞান ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে ঘোড়ায় চড়তে হয় এবং ভালো কাজে কীভাবে ছুরি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে তিনি অবশ্যই মানুষের হৃদয়ে একটি জীবন্ত চিহ্ন রেখে যেতেন, আর তাই সে বেঁচে থাকে’।”

তারপর আমি মধু খাই, টের পাই এর জ্বলে ওঠা স্বাদ। কিন্তু আমার মন খারাপ হয়। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত মৌচাককে অনেক দিন ভুলতে পারি না।
এরপর যখনই আমি “মৌমাছি” শব্দটি শুনি, আমি অবিলম্বে খারিকোলো নামক ছোট পাহাড়ি গ্রামটির ছবি দেখি, যার অর্থ “ঘাসের গ্রাম”। আমি জানি না কে এই নামটি দিয়েছে তবে ঘাস প্রকৃতপক্ষে অন্য যে কোনও জায়গার চেয়ে প্রচুর পরিমাণে সেখানে জন্মায়। ঘাসগুলি বেড়ে ওঠে একটি লম্বা মানুষের কোমর-উচ্চতায় এবং একটি ছোট ব্যক্তির জন্য কাঁধ-উচ্চতায়। তারা বলছেন, সবচেয়ে খারাপ খরার মধ্যেও ওই গ্রামে কারও খাবারের অভাব হয় না।

গ্রামের সবচেয়ে উঁচু প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মৌমাছি পালনকারী নবীর বাড়ি। শরৎকালে তার বাড়ির কাছে রান্নাঘরের বাগানের মাটিতে আলু, গাজর এবং পেঁয়াজ খননের জন্যে প্রস্তুত থাকে এবং বাগানে আছে পাকা আপেল, নাশপাতি এবং কুল। বৃদ্ধ নবী কোন মুখোশ ছাড়াই মৌমাছির মাঝে হাঁটেন। এমন কি গ্রামে একটি গল্পও প্রচলিত যে বৃদ্ধ নবীর জন্ম সাধারণ মানুষের মত হয়নি,  একটি মৌচাকের ভেতর তাঁকে নাকি পাওয়া গিয়েছিল। বৃদ্ধ নবী সারা জীবন মৌমাছি পালন করেছেন, এবং তাঁর বয়স এখন একশ।
তিনি প্রতিটি মৌচাকের পাশে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন, এবং প্রত্যেকটির জন্য তার মুখে আলাদা অভিব্যক্তি রয়েছে। কোনো মৌচাকের কাছে তার মুখ রোদে পালিশ করা পাথরের মতো আলোকিত যদি হয়, অন্যটির কাছে কুয়াশায় মাঝে উদ্ভাসিত পাহাড়ের মতো হয়ে ওঠে। যখন তখন সে ধীরে ধীরে কোনো মৌচাকের চূড়াটি তুলে নেয়, ভিতরে তাকায়, সেখানে ঢুকে যায় এবং ছোট নীল ঘরগুলির মধ্যে দিয়ে তার পথে চলতে থাকে যেখানে কঠোর পরিশ্রমের আইন এবং প্রজাতির স্থায়ীত্ব সর্বোচ্চ নিয়মে বাঁধা থাকে।
“মানুষের জগতে যদি একই শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার থাকত তবে জীবন কত সহজ হত!” বৃদ্ধ নবী প্রায়ই পুনরাবৃত্তি করেন।

দিন-মাস কেটে যাবার পর একসময় সে তার সব কাছের আত্মীয়দের ডাকে। তারা এসে মৌচাকগুলি তুলতে সাহায্য করে। বৃদ্ধ নবী নিজেই সব তোলেন। কোনো মৌমাছি কখনো তাকে দংশন করে না। সবার জন্য তাঁর শুভেচ্ছার বার্তা বয়ে যায়।
– “তাদের কাছে যেয়ো না,” সব অতিথিকে নবী বলেন, “তারা যে গান গায় তা কি তুমি জানো?”
– “না।”
– “বন্ধুর জন্য মধু, শত্রুর জন্য তলোয়ার! মৌমাছিরা জানে কাউকে হুল ফোটালে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তারা তাদের সন্তানদের জন্য তাদের শক্তি বা তাদের জীবন দিতে ছাড়ে না।”
তারপর বৃদ্ধ নবী এক গামলা ঠান্ডা জল নেন এবং মাঝে মাঝে ছুরি ডুবিয়ে মৌচাক কাটতে শুরু করেন। টুকরাগুলি বিভিন্ন আকারের – কিছু বড়, কিছু ছোট। নবী সকল গ্রামবাসীকে মধু দেন। মধুর পরিমাণ হয় পরিবারের আকারের উপর নির্ভর করে।

– “তিনি প্রতি বছর এইভাবে সবকিছু ভাগ করে দেন। শুধু মনে করানোর জন্য যে তিনি এতে কতটা পরিশ্রম করেন!” তাঁর স্ত্রী আক্ষেপ করেন।
– “তোমার কি কিছুর অভাব আছে? তোমার কোন অভিযোগ আছে? যারা তোমার চেয়ে ধনী তাদের দিকে তাকিও না। তাদের দিকে তাকাও, তোমার চেয়ে যারা পিছিয়ে আছে, যারা পঙ্গু,” বৃদ্ধ নবী বলেন।

আমি মধু খাই, কিন্তু আমার হৃদয় সেই একই দুঃখে ভারাক্রান্ত। মধুর প্রতিটি ফোঁটা সত্যিই মৌমাছির চোখের জল যেন। আমি আমার জন্মভূমির বাতাসে শ্বাস নিয়ে পাহাড়ের তৃণভূমি ধরে হাঁটি। আমি ফড়িঙের গানটি শুনি: “আমার জীবন দীর্ঘস্থায়ী হোক,” এরকম যেন বলছে। এবং স্কাইলার্কটিও যেন গাইছে — “অনেক গান আমার হৃদয়ে বাস করে, আমি সেগুলিকে ঢেলে দেওয়ার সুযোগ যেন পেতে পারি।” আমার কানের ঠিক পাশে আমি একটি মৌমাছির গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি: “একটি বন্ধুর জন্য মধু…” মৌমাছি এখন একটি ফুলের উপর থেকে অন্য ফুলের উপর ঘোরাফেরা করছে। সূর্যের আলোতে ডানা ঝলমল করে হঠাৎ মৌমাছি নিচের দিকে নেমে আসে। ফুলগুলি কাঁপছে এবং মৌমাছির সাথে দেখা করার জন্য তার পাপড়িগুলি প্রসারিত করে। এবং পরের মুহূর্তে তারা এক হয়ে যায়।

আমার হৃদয়ে দুঃখ বেড়ে যায়: “প্রিয় আমার, আপনি এভাবেই আমাকে একশটি ফুলের মধ্যে বেছে নিয়েছেন।”

কিন্তু এরই মধ্যে মৌমাছি উড়ে গেছে। তারা কি আর কখনো দেখা করবে? মৌমাছি কি ফুলটির কাছে ফিরবে? মনে হয়, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি ফুলটি থেকে একটি নীল অশ্রু ঝরে পড়েছে।. নাকি হয়তো আমার চোখের জল তার নীল পাপড়িতে পড়েছে?

[Fazu Aliyeva (5 December 1932 – 1 January 2016)]