
ইনফ্রারেড আলো (অনুগল্প)
গুলশন ঘোষ
ভাদ্রের সকালে বৃষ্টি মাথায় নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধা এলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের আশ্রমে।
প্রথম আসা লোকমুখে শুনে।
বারান্দায় তিনি প্রতীক্ষরত। তাকাচ্ছেন এদিকে-ওদিকে। চোখ জুড়েছে এক অজানা আলোয়। দেখছেন শরীরের নানা স্থান থেকে আভরণ সরিয়ে সেই আলোর সামনে মানুষ বসছে এক এক করে।
সকাল-বিকাল অনেকেই নানান ধরণের যন্ত্রণার জন্য এখানে আসে ফিজিওথেরাপি করাতে। এখন ফিজিওথেরাপির যা ব্যয়ভার, তা বহন করা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাধ্যের বাইরে। সেই তুলনায় এখানে ন্যূনতম ব্যয়ে উচ্চমানের নানা ধরনের থেরাপির সুযোগ সবাই পায়। সকাল ও সন্ধ্যায় নানা শ্রেণির মানুষ ভিড়। কত যন্ত্রণা! কত কথা!
ট্রাকশন, আই.এফ টি, টেনস্ আল্ট্রাসাউণ্ড-এর মতো কত ধরনের থেরাপির আধুনিক মেশিন।
যন্ত্রণার ধরন অনুযায়ী ডাক্তারবাবু থেরাপি দেন। ডাক্তারের প্রতি কেউ কেউ প্রবল আস্থাশীল। তাই তিনি দেন তাতেই এরা সন্তুষ্ট।
আবার অনেকেই অতৃপ্ত। তাদের ভবিষ্যৎ যন্ত্রণাও যেন তখন জেগে ওঠে। তাই কেউ বলে কনুইটা একটু ঘষে দিন। কেউ বা বলে কোমরে টেনসটা দিন—জোরে– আরো জোরে—
মন ভরাতে আবার ও প্রয়োজনেও অনেকেই সবগুলোই নেয়।
যাদের খুব ব্যথা ডাক্তার তাদেরকে ইনফ্রারেড আলোর সামনে বসতে বলেন। তখন তাদের কেউ- ঘাড়, হাত, কোমর হাঁটু উন্মুক্ত করে আলো পান করে পরম তৃপ্তিতে।
কিন্তু, অতৃপ্তরা অপ্রয়োজনেও ঘুর ঘুর করে আলো পান করতে।
ব্যথা উপশম, কোষের পুনর্গঠন, কোলজেন উৎপাদন, চুলের বৃদ্ধি, ঘুমের উন্নতি – না জানি আরো কত কাজেই না লাগে বিজ্ঞানের এই আলো।
বৃদ্ধা এই আলোর মাহাত্ম্য জানে না। তবুও আলোর সঙ্গে চোখ জুড়ে থাকা বৃদ্ধা ভাবে তার ছেলেদের যেকোন চোট লাগা ব্যথায় গরম রসুন তেল ঘষে দেওয়ার কথা। তপ্ত চাটু, উনুনের গা কিংবা হ্যারিকেনের মাথায় কাপড়ের পুঁটলি গরম করে ব্যথায় সেঁক দিয়ে কত বার সে যন্ত্রণা কমিয়েছে তার তিনি ছেলের — সে সবই ইতিহাস।
কিছুক্ষণ পর কম্পিত পাখির মতো বৃদ্ধা এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলেন আলোর দিকে। চেয়ার ফাঁকা হতেই বৃদ্ধা ভিজে আঁচলটা মাথা থাকে নামিয়ে ইনফ্রারেড আলোর সামনে মেলে ধরলেন পরম তৃপ্তিতে।
ডাক্তার বিস্মৃত চোখে ইনফ্রারেড আলোর দিকে তাকিয়ে সন্ধান করছেন বৃদ্ধার ভিজে আঁচলের যন্ত্রণার ইতিহাস।