দীপ্তেশ দা’কে একটা ফোন করলে হতনি – ময়ুখ ভট্টাচার্য্য

দীপ্তেশ দা’কে একটা ফোন করলে হতনি – ময়ুখ ভট্টাচার্য্য

দীপ্তেশ দা’কে একটা ফোন করলে হতনি    (হরর কমেডি)

ময়ুখ ভট্টাচার্য্য

সময়টা ২০০৫-২০০৬। নদিয়ার মোহনপুরে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)–এর ছেলেদের হোস্টেল রমন আবাস তখন ছাত্ররাজনীতি, প্রেম–বিরহ, আর হোস্টেলের সব মজার কাণ্ডে ভরা এক অন্য দুনিয়া। A-ব্লকের দ্বিতীয় তলার রুম নম্বর A-2/37 — ওই ঘরটার নাম শুনলেই অনেকের গলায় হঠাৎ একরকম ঠান্ডা কাঁপুনি নামত।
ওই রুমেই থাকত শুভ্রতপাল কর্মকার, সবাই যাকে ডাকত ডেঙ্গু। কারণ, প্রথম বর্ষে পড়ার সময় সে মারাত্মক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। সুস্থ হওয়ার পর থেকেই নাকি মাথা ঠিক ছিল না। মাঝরাতে বলত — “জানলার ধারে কেউ বসে থাকে, আমার নাম ধরে ডাকে…”

একদিন সকালে দেখা যায়, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা ভেঙে ঢুকে ছাত্ররা দেখে — ডেঙ্গু গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে, দেওয়ালজুড়ে লেখা — “আমি ফিরে আসব।”
দেওয়ালে আরও ছিল এক অস্পষ্ট তরুণীর মুখ, হিজিবিজি আঁকিবুঁকি, আর নানা কাটা দাগ।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছিল— “মানসিক অবসাদ”। হোস্টেলে কানাকানি— “ডেঙ্গু নাকি মরেনি, ওর আত্মা ওই রুমেই ঘোরে।”

দু’বছর পরে সাহস করে ওই ঘরে উঠে দুই নতুন ছাত্র — সব্যসাচী কোলে আর সৌরভ বসু। প্রথম দিন হাসতে হাসতে বলেছিল, “আরে এসব গপ্পো! পড়ার জায়গা, ভয়ের না।”
কিন্তু তৃতীয় রাতেই দুজনের একই দুঃস্বপ্ন — একটা ছায়া এসে ঘাড়ের কাছে ফিসফিস করে বলছে, “আমি ফিরে এসেছি।”
সকালে দেওয়ালে আবার সেই রক্তের মতো দাগ, আঁকিবুঁকি! ওরা দিশেহারা হয়ে মেসে গিয়ে বলে, “দীপ্তেশদা! ওই ঘরে কিছু আছে।”
দীপ্তেশ রায়, সবার মেস বাবা, মানে সেই সময়ের রমন আবাসের মেস সেক্রেটারি — শান্ত, নরম, উত্তরবঙ্গের ছেলে। তবে গুজব ছিল, ওর নাকি এক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ। রাতের দিকে ছাদে উঠে আস্তে আস্তে ফোনে কথা বলতে দেখেছে অনেকেই।
মেসের ডিলার বিপুল দা (বিপুল সাহা), বয়স পঞ্চাশ পেরোনো, অভিজ্ঞ মানুষ। চা খেতে খেতে বলত — “ওই রুমে আমি নিজে গেছিলাম ডেঙ্গু মরার রাতে। খাটের নিচে একটা ছেলেকে বসে থাকতে দেখেছিলাম… মুখ দেখা যায়নি।”
আর ছিল রাজু দাস, ক্যান্টিনের মালিক। গোলগাল চেহারা, হাতে স্টিলের মোটা বালা, চুল এমন যেন সজারুর কাঁটা। সবসময় হাসে — এমন হাসি যেটা বোঝা যায় না, মজা না ভয়! রাতে ক্যান্টিন বন্ধ করে চুপিচুপি রুমে গিয়ে কিসব মালাটালা জপত — মোমবাতি, কাঁচের বোতল, আর একটা পুরনো স্প্রাইটের বোতল ভর্তি জল নিয়ে। কেউ জানত না, কেন।

পরের সেমিস্টারে এসে রুম A-2/37 দখল নেয় দু’জন নতুন ছোকরা — সুপ্রভাত ঘোরাই আর শঙ্খজিৎ দাস। সুপ্রভাত — গড়বেতার ছেলে, পশ্চিম মেদিনীপুরের গন্ধ লেগে থাকা চেহারা। লম্বা, পাতলা, মুখে চিটচিটে ভাব, কথা বললে ‘ত’ হয় ‘ট’, ‘দ’ হয় ‘ড’। ভয় পেলেই বলে — “ডাডা……ডাডা…… আমরা কি আর পারবো…!” এমন সুরে বলে, শুনে যেন পিত্তি জ্বলে যায়।
শঙ্খজিৎ — শুকনো গড়ন, ছোট মুখ, ঘুম থেকে উঠেই মুখে একখানা বিড়ি। চাদর মুড়ি দিয়ে শুলে মনে হয় তিন দিনের পুরনো কোনো লাশ পড়ে আছে। দাঁত মাজে না, কিন্তু রান্না করে বাঘা। “পেছন চুলকে এমন মাংস রাঁধত, ছেলেপুলে আঙুল চেটে খেত!”
একদিন রাতে হঠাৎ হোস্টেলে হাজির হয় এক সিনিয়র — মনোশিজ দাস। লোকের মুখে শোনা, ও নাকি গোপনে তন্ত্রসাধনা করে। রুম পরিদর্শনে এসে দেওয়ালের হিজিবিজি দেখে ওর চোখ চকচকিয়ে ওঠে। মন্ত্র পড়তে শুরু করে — “উচাটনি পাচাটনি নিপাটনি চাপাটিলা, কুনকুনি ঘিনঘিনি মিনমিনি চালকলা…..!”
তারপর একটা ইটের টুকরো কেটে দণ্ডি বানিয়ে, রাজুর স্প্রাইটের বোতলে জল এনে মন্ত্র ফুঁকে ছুঁড়ে মারল রুমের দিকে। হঠাৎ জানলার কাঁচ ফেটে গেল — যেন কেউ ভেতর থেকে ঠেলে দিল।
সবাই ছুটে পালাল। শুধু মণোশিজ দাঁড়িয়ে, কাঁপা গলায় বলল —“এখানে ও আছে… কিন্তু ও একা নয়।”

তারপর দিন জানলার কাঁচ ভাঙার জন্য হোস্টেলের স্টুয়ার্ড জালাল দা (জালালউদ্দীন মহম্মদ) মনোশিজকে ফাইন করে। সেদিন রাতে রুমে শঙ্খজিৎ আর সুপ্রভাত দু’জনেই ভয় পেয়েও থাকতে চাইল। ঘড়ির কাঁটা রাত ৩ টা। পাখা হঠাৎ থেমে যায়। দেওয়ালের রক্তের দাগ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ছায়া। ছায়াটা বলল — “দীপ্তেশ……..”
অচেতন হয়ে যায় দু’জন। পরদিন সকালে হোস্টেলে শোরগোল। দীপ্তেশদার পাত্তা নেই। ওর রুমের দরজা ভাঙা হল। ভেতরে দীপ্তেশের দেহ ঝুলে আছে, গলায় ফাঁস। পড়ার টেবিলে বইয়ের মধ্যে চাপা দেওয়া একটা চিঠি — “আমি ভুল করেছিলাম। আমার জন্যই ডেঙ্গুকে মরতে হয়েছিল।”
সবাই স্তব্ধ। বিপুলদা নিঃশব্দে বলল — “তাহলে সত্যিই…দীপ্তেশ জঙ্গি সংগঠনের লোক ছিল ?”
পরে জানা গেল — ডেঙ্গু সেই সময় দীপ্তেশের অপরাধের সাক্ষী হয়ে গিয়েছিল। দীপ্তেশ মোহনপুর ও বড়জাগুলি বাজারে বিষ্ফোরণের ছক কষছিল গোপনে। ডেঙ্গু তা জেনে যায় ও সবাই কে তা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেয় দীপ্তেশকে। তারপর এক শীতের রাতে দীপ্তেশ চুপচাপ ডেঙ্গুকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। সেদিন থেকেই রুমটা অভিশপ্ত। তার কিছু দিনের মধ্যেই ওই দুই এলাকায় বিষ্ফোরণ হয়। পুলিশি তদন্ত হয়। দীপ্তেশকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল বটে, তবে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ঘটনা ধামাচাপা পরে যায়।

রাত নেমেছে। থানার গাড়ি দীপ্তেশের দেহ নিয়ে চলে গেছে পোস্টমর্টেমের জন্য। চারদিক নিস্তব্ধ। রমন আবাসের উঠোনে নিভু আলোয় বসে আছে সবাই— কারও হাতে আধখানা জ্বলন্ত সিগারেট, কারও চোখে শুকনো জল। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হঠাৎ লোডশেডিং, বাতাসে ভেসে আসে পচা লোহার গন্ধ, যেন পুরনো শুকিয়ে যাওয়া রক্তের। কেউ কিছু বলতে পারছে না।
সেই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ সুপ্রভাত কাঁপা গলায় বলে উঠল— “ডাডা… ডিপটেশ ডা’কে একটা ফোন করলে হটনি…?” (দাদা … দীপ্তেশ দা’কে একটা ফোন করলে হতনি…….?)
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত শীতলতা, চোখে কাঁচের মতো ফাঁকা দৃষ্টি। কেউ উত্তর দেয় না। শুধু বিপুলদার জ্বালানো মোমবাতির আলোটা কেঁপে ওঠে। ঠিক তখনই — রুম নং A-2/37-এর জানলার কাঁচের ভেতর থেকে জমে ওঠে ধোঁয়া ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় এক চেনা মুখের — চোখ বন্ধ, গলায় দাগ, ঠোঁটে হালকা হাসি। অন্ধকারে রূমের জানলা দিয়ে দেওয়ালে পড়া জ্যোৎস্নার আলোর মধ্যে এক ছায়া ফিসফিস করে বলে— “ফোন করার দরকার নেই… আমি তো এসেই গেছি।”
হাওয়ার দমকে জানলার কাঁচ ভেঙে যায়, আর মোমবাতির শিখা নিভে যায় এক মুহূর্তে।
অন্ধকারে শুধু শোনা যায় সুপ্রভাতের আতঙ্কে জমে যাওয়া গলা — “ডাডা… ও… ও তো ফিরে এল!” জালালদা আর বুঝে পায় না জানলার কাঁচ ভাঙার জন্য এবারে ফাইনটা করবে কাকে।
আর রুম নম্বর A-2/37-এর জানলা দিয়ে ধোঁয়ার মতো সেই ছায়াটা ধীরে ধীরে আবার তাকিয়ে থাকে — যেন পরের ডাকের অপেক্ষায়।