মুক্তগদ্য

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন শরৎ পর্যায় অগাস্ট-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং 

ডাইনোসরের ডিমঃ এক সম্পাদকের জবানবন্দি
তপন দাশগুপ্ত 

প্রয়াত বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী এবং সলিলকৃষ্ণ দেববর্মনের স্নেহসিগ্ধ অকৃত্রিম উৎসাহ, শ্রদ্ধেয় বিমলদা (শ্রী বিমল চৌধুরী) – যিনি এখনও যেকোন তরুণের সাহিত্য প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরোদগমে নিরলস উৎসাহ যুগিয়ে যান; অনিলদার (সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য) “সমাচার” পত্রিকা অফিস, যেখানে সাহিত্যিকদের একটা মজলিশ গড়ে উঠেছিল, স্বপন সেনগুপ্তের সাহিত্য নিষ্ঠা, কল্যাণব্রত চক্রবর্তীর ধনুকের ছিলার মত কবিতার লাইন, প্রদীপ চৌধুরীর রেক্‌লেস শব্দাবলী – ষাটের দশকে এই রাজ্যে একটা প্রকাশের যন্ত্রণার বিচ্ছুরণ সৃষ্টি করেছিল। ভারতের প্রান্তে অর্থনৈতিক সংকট, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, কর্মচারীদের মধ্যে এক বিস্ফোরণের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল রাজপথে দৃঢ়মুষ্ঠি মিছিল। মিছিলে পাঁজর কাঁপছিল, একটা নতুন সূর্যের অভ্যুদয়ের অপেক্ষায় মানুষ দিন গুনছিল, যার প্রভাব থেকে আমরাও মুক্ত ছিলাম না, মুক্ত থাকতেও চাইও নি।
ঊনসত্তর-সত্তরে আমাদের ঘরের কাছে যখন একটা মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম চলছিল এমনি সময়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিই। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা আছে – ‘হাল’ আমাদের চিন্তাধারা প্রকাশের বাহন…ত্রিপুরার অতীত ও বর্তমানকে সারা ভারতের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা এর উদ্দেশ্য। আমরা উচ্চাঙ্গের সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রয়াসী হব”। সাহিত্যের উদ্দেশ্য, আধুনিকতার সংজ্ঞা ইত্যাদি নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আমাদের একটা পার্থক্য অবশ্যই ছিল। আমরা তখন বুঝেছিলাম তথাকথিত আধুনিকতা এসেছে “বুর্জোয়া ডেকাডেন্স” থেকে। আমাদের মনে হয়েছিল এবং যা এখনো বিশ্বাস করি পশ্চিমা সভ্যতার সংকট অকৃত্রিম যেখানে, তৎকালীন আমাদের এংরী-হাংরীরা সম্পূর্ণ নকল। দায়মুক্ত নান্দনিক বিলাসিতার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। লিখেছিলাম “ত্রিপুরায় ইতিমধ্যেই বেনিয়া সাহিত্য ও অতি বিশুদ্ধ নান্দনিক বিলাসিতার মানসিকতায় আক্রান্ত সাহিত্য শিল্পরুচির মৃত্তিকাকর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। ‘হাল’ সে রকম প্রচেষ্টায় বিশ্বাসী নয়। পরিবার, সমাজ ও শ্রেণীর কাছে সামাজিক মানুষের যে রকম কর্তব্য রয়েছে আমাদের সাহিত্যাদর্শও সেই রকম সামাজিক কর্তব্য সঙ্গে অভিন্ন। ‘হালের’ উদ্দেশ্য প্রচারধর্মিতা ও বিশুদ্ধ সাহিত্যের পথ পরিহার করে জীবন সংলগ্ন সাহিত্যের প্রতি পাঠককে সজাগ রাখা। ষাটের দশকের শেষদিকে পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে উদার রাজানুকূল্য (বিজ্ঞাপন) ছিল। তাই পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা ভীষণ কোন আর্থিক চাপের মুখে পড়িনি। কিন্তু আমরা “রাজার এঁটো” হতে চাইনি। বা এরকম করার প্রচেষ্টাও খুব একটা লক্ষ্য করিনি। আমাদের পত্রিকা প্রকাশে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন, তাদের কয়েকজনের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। এরা হলেন ডঃ সিরাজউদ্দিন আহমেদ, শ্রী কমল রায়চৌধুরী, শ্রী গোপাল দে, শ্রী ঋতেন চক্রবর্তী, শ্রী দুলাল ঘোষ, শ্রী অনুপ ভট্টাচার্য এবং প্রয়াত ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য। ‘হাল’-এর যে লেখাগুলি সেসময় যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেগুলি হল –‘ক্ষুধিত বংশ ও তার কাব্য দর্শন’ (ডঃ সিরাজউদ্দিন আহমেদ), ‘স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী’ (মানস দেববর্মন), ‘সমীরের প্রতিদ্বন্দ্বী’ (বিশ্বজিৎ চৌধুরী)। আমরাই বোধহয় ত্রিপুরার কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে প্রথম আলোচনা করেছিলাম। ঐ পর্যায়ে কবি সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন, কবি পীযূষ রাউত এবং গল্পকার বিমল চৌধুরীর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত দীর্ঘ রচনা “বুর্জোয়া রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ” (ডঃ সিরাজউদ্দিন আহমেদ) যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল। লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশকে যারা ব্যাঙের ছাতার মত স্বল্পায়ু ও সাময়িক বলে আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন, আমি সে দলের নই। প্রতিটি সংখ্যাই তো – এক বা একাধিক হোকনা কেন – সততার ফসল। সেগুলি ‘নাইট কুইনের’ মত হয়ত ভা স্বল্পায়ু, কিন্তু স্মৃতি ভার করে দেয়। আগেই উল্লেখ করেছি পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক সমস্যা বিশেষ ছিল না। ছিল ভাল লেখা ও লেখকের নিষ্ঠা ও সততার অভাব। এবং তাই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ উদ্যোগ একের ওপর বর্তে গিয়েছিল। একজন উৎসাহী সাহিত্যিক (!) নিজের লেখা প্রকাশের সাথে সাথে চুপসে যাচ্ছিলেন। দু’কপি পত্রিকা বিক্রির উদ্যোগও আন্তরিকভাবে নেন নি। আমরা বুঝেছিলাম পাঠক, লেখক ও সম্পাদকের মিলিত প্রয়াসই উত্তরণের একমাত্র পথ। আমরা বলেছিলাম এবং অবশ্যই হতাশা থেকে – আজ ত্রিপুরার পত্রপত্রিকা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে যে প্রবল জোয়ার এসেছে তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ‘হাল’-এর মৃত্যু হলে এ জোয়ার রুদ্ধ হবে না। হাল, জ্বালা, ব্রততী, পৌণমী, সমকাল, কাকলি, দ্যুতি, উদিতী, নবাগত, জোনাকী, অকাল, কাল, ত্রিভুজ, উত্তর, কথা – ইত্যাদি পত্রিকাগুলির সবকটিই উন্নতমানের নয় এবং শেষপর্যন্ত যে সবগুলিই টিকে থাকবে না সেকথা সত্য। কিন্তু একথা বলতে পারি যে এদের মধ্যে থেকে অন্তত কয়েকটি রুচিসম্পন্ন কাগজ অবশ্যই বেঁচে থাকবে, যাদের মধ্যে জন্ম নেবেন কৃতি সাহিত্যিকেরা আমরা সম্পাদকরা যুগপৎ যন্ত্রণা ও পরিতৃপ্তির আশা নিয়ে সেই দিন গুনছি…”
হালের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের সাথে সাথে প্রশ্ন আসে হাল কি “অসূয়ামুক্ত” ছিল? সাহিত্যের গবেষক এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন। ‘হাল’-এর একজন পাঠক লিখেছিলেন – “এই অনুশীলন ও নিষ্ঠার সময় ওরা কেন নিজেকে ‘বড় গোলাম’ ভাবেন। ‘দেশ’-এর পাতায় ঐতিহ্যপ্রেমী যখন বামপন্থী কাগজে সাম্যবাদী সাজেন অথবা শৈলেশ্বরের কাছে দেহজ্বালা ব্যক্ত করেন তখন চরিত্রহীনের সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া যায়। এই ক্ষতিকর খেলায় মানুষের উত্তরণ হয় না। ওরা ডাস্টবিনে চলে যায়। আমরা দুঃখ বহন করি”।
তারপর সময় বয়ে যায় বোধহয় আপন নিয়মে। ত্রিপুরার বুক জুড়ে ঘাতকের মিছিল শুধু। সংজ্ঞাহীনতার মাঝে শুয়ে থাকে বুদ্ধিজীবী কুকুরের মত। মিছিলে মেদের খেলা শর্তবান রাজপুরুষ হাতছানি দেয়, ভগীরথ বলে শুধু ‘বানাও বানাও’।
তাই একদিন হাল-ও আপনা থেকেই “লেনদেন” মুক্ত হয়ে যায়। এরজন্য অনেকেই দুঃখ বোধ করেন। আমাকে “হাল” সম্পর্কে জানতে চাইলে বলি – ডাইনোসরের ডিম।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন