নিবন্ধ

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন শরৎ পর্যায় অগাস্ট-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং 

সাহিত্যে ক্ষয় ও জয়ের ব্যক্তিগত নিয়ম
নকুল রায়

অনেকে মনে করেন, সাহিত্যে জনগণেরর সুখ-দুঃখ লড়াই ক্ষয় জয়-পরাজয় সুন্দর-অসুন্দর সমস্ত নীতির অংশ-গৃহীত পরিচয় দিক। এতে লেখক যেমন, জনগণও উপকৃত হবেন।
শার্ল বোদলেয়ারর একটি উক্তি “ইতিমধ্যেই অনেক বছর হয়ে গেল, ভিক্তর উগো আর আমাদের সঙ্গে নেই। সেই সময়ের কথা আমার মনে পড়ে যখন ভিড়ের মধ্যে তাঁর মুখটিই সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ত; এবং উৎসবের হট্টগোলে বা নির্জনতার নৈঃশব্দ্যে তাঁকে প্রায়শই দেখে বহুবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এই অপরূপ কিন্তু শঙ্কাজনক রুচি নিয়ে কীভাবে তিনি কাজের কঠোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে বেড়ানো ও স্বপ্নালু ‘রেভেরি’-কে মেলাতে পারেন? এই বাহ্য বৈষম্যটি স্বাভাবিকভাবে হল – একটি স্বনিয়ন্ত্রিত জীবন ও আত্মিক দার্ঢ্যের ফল যার জন্যে তিনি চলতে চলতেই কাজ করতে পারেন, বা বলা যায় যে, কেবল কাজ করতে করতেই তিনি চলতে পারেন, সূর্যালোকে, জনতার ভিড়ে, কলার আশ্রয়স্থলগুলিতে ও ধুলিধূসর পাঠাগারে হাড়-কাঁপানো হাওয়ার মধ্যে সর্বত্র শান্ত ও ধ্যানমগ্ন ভিক্তর উগোর ভাবটি ছিল যেন তিনি সর্বদাই বহিঃপ্রকৃতিকে বলছেন, ‘আমার চোখের মধ্যে ভালো করে ঢুকে যাও যাতে তোমায় আমি মনে রাখতে পারি’।(নারায়ণ নুখোপাধ্যায়, শার্ল বোদলেয়ারের গদ্য”।
অপূর্ব কথা, আমরা এর আগে এমন গদ্য শুনিনি যে, ‘আমার চোখের মধ্যে ভালো করে ঢুকে যাও যাতে তোমায় আমি মনে রাখতে পারি’। আমি যদি দেখতেই না –পাই, আমার যদি চোখ থেকেও অন্ধত্ব, অন্তশ্চক্ষুর প্রশ্নই ওঠে না; পর্যবেক্ষণের প্রথম শর্ত স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিশ্লেষণের বুদ্ধির পাত্রটি; এবং চিন্তনচেতনার সঙ্গে বুদ্ধি ও মননের সংমিশ্রণে সেই পাত্রটি পূর্ণ করা। পাত্র ফুটো থাকলে, এতো খেজুরগাছের মাথায় রসের রগ বুঝে বাঁশের পাতলা ছুরি ঢুকিয়ে কলসিভর্তি রস আদায় করা। কোন্‌ বোকা কানা কলসি ঝোলাবে! সারারাত বিন্দু বিন্দু রস জমে কলসিপূর্তি হয়; ‘আমার চোখের মধ্যে ভালো করে ঢুকে যাও যাতে আমি তোমায় মনে রাখতে পারি’ – কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেয়েও শুধু অন্তশ্চক্ষুর বিকলাঙ্গতার (কলসি ফুটো) কারণে রস সংগ্রহে ব্যর্থ হই। তখন চোখের সামনের ঘটনা ঐতিহাসিক হলেও তার শুধু বিবৃতি থাকে, মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য থাকেনা বলে সে সাহিত্য অসাড়, স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেসব বিচক্ষণতাহীন।
একধরনের অনুচ্চারিত অনড় মনোভঙ্গি থাকে যেখানে, সেসব সাহিত্য কারো আদেশ ও নির্দেশক্রমে সৃষ্টি হয় না; অনবরত ক্ষয় জেনেও। সুতরাং, ক্ষয়িষ্ণু সমাজের চিত্রপট আঁকা মানেই সাহিত্য নয়, সাহিত্যে কল্পনাপ্রতিভার আয়োজন যেখানে ঘাটতি, সেইসব লেখকের কাজ নিজের সৃষ্টিকর্মে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। ফোটোগ্রাফ যতই উন্নত হোক, সে পোর্ট্রেট নয়, পোর্ট্রেট হবে ভিতরের মানুষটির গুপ্ত পরিচয়, সেই মানুষটির মুখাবয়বের সমস্ত রেখার অভিব্যক্তি হবে একই সঙ্গে শিল্পীর প্রতিভার বিকাশকর্ম। সাহিত্য এ কাজটি করে এবং বেশ পারদর্শিতার সঙ্গে করে বলেই শিল্পীর তুলিটি লেখকের কলম-নিঃসৃত ভক্তিভঙ্গিটি।
কলমের ভক্তিভঙ্গিটি দেখুন, কল্পনাপ্রতিভার লেখক ভক্তি দিয়ে লেখে। কাগজের উপর লেখক তিন আঙুলে কেবল রং খোদাইকর্ম কর্ষণ সব করে যাচ্ছেন; তার আপাদমস্তক চৈতন্য তখন কলমের মুখ দিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে; এটার নামও স্বার্থপরতা। কীরকম স্বার্থপরতা? যে স্বার্থপরতা পরার্থপরতায় অবিরাম নিয়োজিত যতক্ষণ না একজন গর্ভবতী তাঁর সন্তান প্রসব না করে। গর্ভবতী মহিলা সন্তানধারণ সময়কালে, তাঁর নিজের মুখের খাবার সন্তানের খাবারের অংশগৃহীতা, তিনি শুভবুদ্ধি ও চেতনার রসের মাধ্যমে তাঁর পেটের ভুবনে আলোকিত প্রজন্ম ধরে রাখেন; এটাই স্বার্থপরতা যা পরার্থপরতায় সন্তান প্রসবের মুক্তি চায়।
লেখক সেরকম। সবটা সেরকম না-হলেও তুলনা অতুলনীয়। যা বেশি মূল্যবান তা অমূল্য অর্থাৎ কোনও পার্থিব সম্পত্তি দিয়ে তাকে কেনা যায় না; মানুষের জীবন এতই মূল্যময় যে, তাকে পেয়ে তারও যে একটি জীবন-শরীর আছে, সেও যে খাদ্য চায়, সূক্ষ্ম বোধশক্তির বিনিময়ে আরও বেশিদূর বাঁচতে চায়; সেই জীবনের ক্ষয়রোধ করারও সাময়িক চেষ্টা থাকে প্রতিভাধর লেখকের। জীবনকে প্রাথর্না করে জানা যায় না, যায় বহু ব্যবহারে। এই বিবর্তন লেখকের মস্তিষ্কে বিপ্লব তৈরি চেতনার মাধ্যমে; আর সেই লেখক না লিখে বাঁচতে পর্যন্ত চাইবেন না; সৎ লেখকের জীবনে মৃত্যুর বন্ড-সইটি তিনি নিজে করেন না; লোকে অর্থাৎ পাঠক-পাঠিকারাই তাঁকে জানিয়ে যায়, ‘তুমি আরো লেখো, আর আমাদের ভাবনার জগতের প্রদীপটির সলতে হয়ে বেঁচে থাকো’। এ স্বভাবের লেখকের জীবনী খুব কম পড়া যায় জীবনে। তাঁরা যতটা দেখেন, তার চেয়ে অনেক কম লেখেন; অনেক সংযম অনেক অনুধ্যানের ফলে যদি একটি কবিতা হয়, তবে তার মূল্য অমূল্য; তাকে চিনতে গেলে সময়কে পার করে অর্থাৎ সেই কবির সময়কে অতিক্রম করেই চিনতে হয়।
কথাটা এরকম, সত্যদ্রষ্টা কবি বোদলেয়ার যা বললেন, ‘আমার চোখের মধ্যে ভালো করে ঢুকে যাও যাতে আমি তোমায় মনে রাখতে পারি’। সত্যদ্রষ্টা কবি জীবনানন্দ দাশকেও তাঁর সময় অতিক্রম করে আমরা ধরতে শিখেছি, কিন্তু স্বীকার করিনা অনেকানেক কবিরাই। দিবান্ধ কবিরাই এটা করে; অন্ধকারে চেনার মতো পেঁচার আঁখি নেই আমাদের অনেক কবিদের। ধ্বংসে উন্মাদ পৃথিবীর কিছু অমানুষদের ‘সুপরামর্শে’ আমাদের দিনানুদিন-যাপন। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী? সাহিত্যপাঠে আমাদের হিংস্রতা কমে, মানুষের পদধ্বনিতে বিপ্লব সংগঠিত হয়; এটা খুব দূরের আশা নয়, একেবারে সন্নিকটে তার আয়োজন চলছে। কোনও কম্পিউটারই মানুষের বোধ-মস্তিষ্ক-অন্তঃকরণের চেয়ে বড়ো নয়, মহান তো নয়ই। সন্ত্রাস যাদের অস্ত্র, ক্ষয় তাদের বেশি; একটি বোধের সাঁকো, মানবিক নড়নী সাঁকোও জয়ের পথ খুলে দেয় মানুষের। তাই সাহিত্যকে যে সাধনা মনে করে তার ক্ষয়রোধের ক্ষমতাবেশি, জীবনজয়ের বলিষ্ঠ প্রতিমূর্তি তাঁরই থাকা উচিৎ, এবং মানুষের তৈরি সভ্যতার ভাঁড়ারে।
সৎ লেখার ওজন এত বেশি যে, কল্পনাপ্রতিভাধর ছাড়া চোখের ভেতর প্রবেশ করে মনের পর্দা নাড়ানো দুর্বলের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। মন যে শক্তি, তা একটি লেখার পরেই মনে হয়, এবং মনে হতে বাধ্য। লেখা একটি শক্তি, বোধশক্তি।
নিশ্চয়ই হ্যাঁ, লেখা একটি শক্তি, তার নাম বোধশক্তি। আমি কেনো নিজেকে লেখক বা কবি বলে গর্ব অনুভব করব, যখন একটি বাক্য তৈরির আগেই নিজেকে কুর্নিশ দিয়ে ফেললাম! পা ছুঁয়ে বসে আছি এমন মানুষের যাদের পোষাকে ও বোধে সন্ত্রাসের রক্ত লেগে আছে; হাত ধরে বসে আছি এমন মানুষের যাদের বৈরিতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে --- সেসব মানুষের মনতুষ্টির জন্যে আমার কোন লেখা হতে পারেনা; যদি হয় তা লেখকের নয়, দালালের মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়।
লেখক জীবন গর্বের নয়, গৌরবের। গর্বে অহংকার নির্জ্ঞানের অহংকার; গৌরব জয়ের পথে মানুষকে টানে, আপামর মানুষের স্রোতকে। না বুঝুক সাহিত্য সকলে; যারা বোধে বোঝে, বোঝাবে তারা। সমবেত চোখে বইয়ের পৃষ্ঠা কেউ পড়ে না, একজন পড়ে দশজন শোনে। আবৃত্তি এভাবেই এসেছে। ক্ষয়ের মৃত্যু জয়ের পদক্ষেপে সুনিশ্চিত হওয়া চাই। কবি যা জেনে নিজের কবিত্ব থেকে কবিতা লেখেন, আবৃত্তিকার সে কবিতাই বোধের থেকে বোদ্ধাদের পড়ান – সেটাই শিল্পকৃতি। শিল্পকৃতিতে কৃতীমান হওয়া না-অব্দি কবিতা আবৃত্তির আগে কবিতাপাঠই বেশি বেশি হওয়া উচিত। তারপর একদিন মানুষের মজলিশে আসা প্রয়োজন। বোধিমানরা বুঝুক কবিতা কী জিনিস।
ক্ষুরের বুকে ক্ষয় টের পায় পিঁপড়ে। তাই সে নির্বিঘ্নে হাঁটে। যাদের জীবন ধারালো ক্ষুরের বুক দিয়ে চলে, তাদের মুখ ও হৃদয় সর্বক্ষণ জোনাকির মতো জ্বলে। আমার এই বক্তব্যটি কবিতার মতোই শোনায়। যে শব্দোচ্চারণে শিল্প খুঁজে তার কষ্ট ক্ষুরের বুকে হাঁটার মতোই। কারণ তার কাছে কবিতার শব্দোচ্চারণ মানে গর্বের বিষয় নয়, গৌরবের। আমরা সাধারণ মানুষ যখন কোন কাজে কৃতিত্ব অর্জন করি, গৌরব বাসা বাঁধে। ওই তাকে ধরেই পরবর্তী ক্ষয়রোধ করে গৌরবের পথে হাঁটি।
লেখক তারাই হয় না যাদের মন সংকীর্ণ। কিন্তু না-বেঁচে লেখার চেয়ে মরাই ভালো --- এরকম কোন লেখক হয় না। সর্বদিকভুক যারা, তারা সংযম কাকে বলে জানে। শব্দের পর শব্দ বসিয়ে যেসব বাক্যে সাহিত্য হয়, তা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তুললে যদি দেখা যায় যে, সেসব গুঁড়ো মশলার মতো বর্জনীয় অংশ, তাহলে আমার পরিশ্রমকেই ব্যর্থ বলে অপমান করা উচিত নয়; কারণ হীনম্মন্যতা, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে বেঁচে থাকার নাম জীবনযাপন। মহৎ লেখককে এ কথাটি ভাবতেই হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই পচনশীলতা রক্ষা করে চলে কিছু মানুষ এবং তাদের ভেতর ক্ষমতাধরের সংখ্যাও কম নয়, যারা প্রচ্ছন্নে আমাদের স্মাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে চলেছেন, তাদের কথায় লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে কেন!
মানুষের পক্ষে মনুষ্যত্বের পক্ষেই সাহিত্য, কিন্তু গণসাহিত্য বলতে কিছুই নেই। সাহিত্য গণতা দিয়ে বোঝানো যাবে না; সমাজের ক্ষয় ও জয় দুটোই সাহিত্যের বিষয় হতে পারে, তবু বলা যাবে না সাহিত্য সর্বস্তরের আপামর জনসাধারণের বোঝার জিনিস।
লেখকের বিচার হয় তার লেখাসাহিত্যে। বিচার কে করবে? এখন বিচারকেরও বিচার করা প্রয়োজন। একজন সমালোচক খুব সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর রুচিমানতা সর্বগ্রাহ্য হবে এটাও আশা করা যায় না। আবার লেখক ও তাঁর লেখা সমালোচনার ঊর্দ্বে, এসবও হঠকারী মনোভাব। এও ঠিক, লেখক সমালোচকের ভয়ে তাঁর লেখা বইটি পুনর্বার লিখবেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনও লেখক নিজেকে ঈশ্বর ভাবেন না। লেখক যখন নিজেই সৃষ্টির সহায়ক হয়ে যান, তখন আত্মসমালোচনাই তাকে সমৃদ্ধ করে এবং পরবর্তী লেখাটির সময় স্বাভাবিক কারণেই সমালোচককে তাঁর মনে পড়বে।
এই সংযমই লেখককে বড়ো করে তোলে, দায়িত্বশীল মানুষের এই কল্পনাপ্রতিভার সৃষ্টিই বহু অগ্রগামী লেখকের জন্ম দিতে সক্ষম, --- তাঁর জীবনীপাঠ ও তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন